ঢাকা মহানগরে সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করার চেষ্টা করছে বিএনপি। এ জন্য ঢেলে সাজানো হবে ঢাকা মহানগর বিএনপির উত্তর ও দক্ষিণ। মেয়াদ শেষ না হলেও দুটি কমিটি পুনর্গঠন করা হতে পারে। পাশাপাশি জাতীয় কাউন্সিলের আগে পুরো সাংগঠনিক কাঠামো ঢেলে সাজানোর পরিকল্পনা করেছে ক্ষমতাসীন দলটি।
বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের কয়েকজন নেতা সমকালকে বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর সরকার গঠন করেছে বিএনপি। এখন আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করতে দলটির ৮২ সাংগঠনিক ইউনিট কমিটি থেকে শুরু করে এর সব অঙ্গসংগঠনকে ঢেলে সাজানো হবে। এর অংশ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিট ঢাকা মহানগর উত্তর ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির কমিটিকেও পুনর্গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ওই নেতারা জানান, এবারের প্রতিটি কমিটি গঠনে যেমন ত্যাগী, যোগ্য নেতাদের সামনে রাখা হবে, তেমনি অভিজ্ঞদেরও মূল্যায়ন করা হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, বিএনপি এবং এর সব অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন ঢেলে সাজানোর কার্যক্রম দ্রুত শুরু হবে। সাংগঠনিক গতিশীলতা ফেরাতে শিগগিরই বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল আয়োজন করা হবে।
বিএনপির আরও কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, প্রায় এক দশক পর জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের প্রস্তুতি জোরদার করছে দলটি। চলতি বছরের সুবিধাজনক সময়ে তা করা হবে। এর আগে বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন, মহানগর ও জেলা পর্যায়ের কমিটিগুলো পুনর্গঠনের মাধ্যমে সংগঠনকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৭ জুলাই ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়। ওই সময়ে ঢাকা মহানগর উত্তরে আহ্বায়ক করা হয় জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক সভাপতি সাইফুল আলম নিরবকে, সদস্য সচিব করা হয় আমিনুল হককে। দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটিতে রফিকুল আলম মজনুকে আহ্বায়ক এবং সদস্য সচিব করা হয় তানভীর আহমেদ রবিনকে। পরে সাইফুল আলম নিরবকে তাঁর পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ায় ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর আমিনুল হককে আহ্বায়ক এবং মোস্তফা জামানকে সদস্য সচিব করে আহ্বায়ক কমিটি করা হয়।
দক্ষিণে আলোচনায় আছেন যারা
ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ফেনী-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। এখন তাঁকে নিজ এলাকায় বেশি সময় দিতে হচ্ছে। এ কারণে তিনি ঢাকা মহানগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ইউনিটের তৎপরতায় তেমন সময় দিতে পারবেন না বলে মনে করছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা।
মহানগর দক্ষিণ বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, বর্তমান কমিটির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে কারা-নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এ কারণেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পছন্দের তালিকায় রয়েছেন রবিন। এদিকে ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবরের আন্দোলনে যখন দল ও সংগঠনের বেশির ভাগ নেতা কারাবন্দি কিংবা আত্মগোপনে চলে যান, তখন ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন লিটন মাহমুদ। ওই সময়ে আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার জন্যও দলের চেয়ারম্যানের সুনজরে রয়েছেন বলে জানা গেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে রবিন-লিটন কমিটির ওপরেই ভরসা করা হতে পারে।
এ ছাড়াও আলোচনায় আছেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের আহ্বায়ক এনামুল হক এনামসহ বেশ কয়েকজন।
কদমতলী থানা বিএনপির আহ্বায়ক আবু নাসের ফকির সমকালকে বলেন, দলের দুর্দিনে তানভীর আহমেদ রবিন ও তাঁর পুরো পরিবার নেতাকর্মীদের জন্য ঢাল হয়ে ছিলেন। প্রতিটি কর্মসূচি বাস্তবায়নে রবিন নিজে মাঠে ছিলেন। এ জন্য তাঁকে অনেক ত্যাগ আর নির্যাতনের শিকারও হতে হয়। এখন সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে শক্তিশালী মহানগর কমিটি গঠন অত্যন্ত জরুরি। ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের মূল্যায়ন না করলে নির্বাচনে বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।
নিউমার্কেট থানা বিএনপির নেতা আব্দুল হাই বলেন, ১৭ বছর ধরে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, এমন নেতাদের মূল্যায়ন করে মহানগর কমিটি গঠন করতে হবে। অন্যথায় নেতাকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ ও হতাশা দেখা দিতে পারে।
উত্তরে আলোচনায় আছেন যারা
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক বর্তমানে টেকনোক্র্যাট কোটায় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে পরাজিত হন তিনি। তবে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক এই অধিনায়ককে সরকারের মন্ত্রিসভায় ডেকে নিয়েছে দল।
সাফ গেমস বিজয়ী ফুটবলার আমিনুল হক ২০২১ সাল থেকে বিভিন্ন মেয়াদে বাংলাদেশ ঢাকা মহানগর উত্তর শাখার গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। ওই বছরের ২ আগস্ট গঠিত ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৪৭ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটিতে তিনি প্রথম সদস্য সচিবের দায়িত্ব পান। ওই সময় আহ্বায়ক ছিলেন ডাকসুর সাবেক ভিপি আমান উল্লাহ আমান। পরে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সাইফুল আলম নিরব আহ্বায়ক হলে তিনি আবার সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ৪ নভেম্বর ঘোষিত আংশিক আহ্বায়ক কমিটিতে আমিনুল হককে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক করা হয়।
মহানগর উত্তর বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, আমিনুল হক গুরুত্বপূর্ণ এই সাংগঠনিক ইউনিটের দায়িত্বে আসার পর থেকে সংগঠন অধিক শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি নেতাকর্মীরাও সক্রিয় হন।
শুধু মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীই নন, বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও বলছেন, ঢাকা মহানগর কমিটি অনেকবার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু বর্তমান কমিটি সেরা নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের নেতৃত্বে যেমন জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে সুফল এসেছে, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও বিএনপি প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন। কারণ তারা জানেন, কারা আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন। ফলে মহানগর কমিটিতে তাদের নেতৃত্বে থাকা উচিত।
এ ছাড়াও মহানগর উত্তর বিএনপির আলোচনায় আছেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মামুন হাসান, মহানগর বিএনপির নেতা এসএম জাহাঙ্গীর, এবিএম আব্দুর রাজ্জাক, মোস্তাফিজুর রহমান সেগুন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক