সিরাজগঞ্জের শিল্প পার্কে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ ক্ষূদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন-বিসিক। কমিটিকে সরেজমিনে শিল্প পার্ক এলাকা পরির্দশন করে বিসিকের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তবে সেই তদন্ত নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। অভিযোগ উঠেছে, শিল্প পার্ক নিয়ে বিভিন্ন সময় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও, তদন্ত চলছে ডিমে-তালে। স্থানীয়দের অভিযোগ, অনিয়ম ও দুর্নীতি ধামাচাপা দিতেই চলছে লোক দেখানো তদন্ত।
সূত্র জানায়, গত ১৬ নভেম্বর বিসিকের প্রধান কার্যালয় থেকে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি সরেজমিনে সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক এলাকা ঘুরে দেখে। কমিটিতে বিসিকের পুরকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ফেরদৌস জামানকে আহবায়ক এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনা ও বাস্তবায়ন বিভাগের সম্প্রসারণ কর্মকর্তা আজিজুর রহমানকে সদস্য সচিব করা হয়। বাকি তিন সদস্য হলেন, পরিকল্পনা ও গবেষণা বিভাগের পরিকল্পনা কর্মকর্তা আসমাউল ইসলাম সিয়াম, সহকারী প্রকৌশলী শাহাদত হোসেন ও সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপার্ক প্রধান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) হিরম্ময় বর্দ্ধন।
এর আগে, বিভিন্ন সময় বিসিকের প্রকল্প এলাকার ড্রেন, ড্রেনে ব্যবহৃত মালামাল, রাস্তার পুরুত্ব, রাস্তায় ব্যবহৃত মালামাল, সাববেজ, সোলডারের কাজ ও প্রকল্প এলাকায় বালু ব্যবহার নিয়ে অভিযোগ উঠে। যা দুদকের নজরে আসলে শুরু হয় তদন্ত; তবে কোনো তদন্তই এখনো আলোর মুখ দেখেনি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এত সময় হলো এখনো তদন্ত করে অভিযুক্তদের শাস্তির আওতায় আনা হলো না। উল্টো অনিয়মে জড়িত থাকা কর্মকর্তাদের বাঁচাতে লোক দেখানো তদন্ত করছে বিসিক। রক্ষক ভক্ষকের ভূমিকা পালন করলে সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যাবে।
এ বিষয়ে বিসিক চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, অনিয়ম নিয়ে দুদকের তদন্ত চলমান, আমাদের তদন্তও চলছে। তবে প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি।
তদন্ত কমিটির সদস্য সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্পপাকের প্রধান হিসেবে দায়িত্বে থাকা হিরম্ময় বর্দ্ধন এ বিষয়ে কিছুই জানাতে পারেননি।
অনিয়ম নিয়ে গত বছরের ৬ মার্চ শিল্প পার্ক এলাকা পরিদর্শন করে দুর্নীতি দমন কমিশন। দুদকের আঞ্চলিক কর্মকর্তা ইসতিয়াক আহমেদ জানান, সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্ক এলাকা পরিদর্শন করে আমরা বেশ কিছু অনিয়ম পেয়েছি। বিসিক থেকে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসও নিয়েছি।
এর আগে গত বছরের ১৬ আগষ্ট বন্ধের দিনেই বিসিক শিল্প পার্কের প্রধান পরিচালক আব্দুল মতিন ও বিসিক শিল্প পার্কের একাধিক কর্মকর্তা, প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় পরিচালক আব্দুল মতিনকে শিল্প পার্কের ড্রেন, ড্রেনে ব্যবহৃত মালামাল, রাস্তার পুরুত্ব, রাস্তায় ব্যবহৃত মালামাল ও প্রকল্প এলাকার বালু ব্যবহার করে সাববেজ ও সোলডারের কাজ নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা প্রশ্ন করলে কোন মন্তব্য করেননি। পরিদর্শনে কী দেখলেন এমন প্রশ্নে তড়িঘরি করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন আব্দুল মতিন। শিল্প পার্ক পরিদর্শনের সময় তিনি রাস্তার কোথাযও কোনো মেজারমেন্ট নেননি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিসিকের এক কর্মকর্তা জানান, ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তা জামানত নেওয়ার জন্য ইতোমধ্যে বিসিকের প্রধান কার্যালয়ে চিঠি দিয়েছে, এজন্য স্যার সেসময় পরিদর্শনে এসেছিলেন।
সূত্র জানায়, সিরাজগঞ্জ বিসিক শিল্প পার্কের কাজ শেষ না হলেও আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের একাধিক প্রভাবশালী ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে বিসিক প্রকৌশল বিভাগের পরিচালক আব্দুল মতিন ও সাবেক প্রকল্প পরিচালক জাফর বায়েজিদ গত অর্থ বছরের (২০২৩ -২০২৪) জুনে শতভাগ বিল দিয়ে দেন। গত ৩০ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যোক্তাদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে প্লট।কিন্তু প্রকল্প বাস্তবায়নকারীদের দূর্নীতি ও অনিয়মের কারণে উদ্যোক্তারা এখনও প্লটে কাজ শুরু করতে পারেননি। অসমাপ্ত কাজের কারণে, সেই সম্ভাবনাটি এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এর আগে গত বছর ২ জুন ও ১৯ জুন ২৬ জুন বিসিক শিল্প পার্ক প্রকল্প নিয়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশ হয়। যেখানে হেরিংবন্ডে নিম্নমানের অর্ধাংশ ইট ব্যবহার করে রাস্তা নির্মাণ, নিম্নমানের ইট দিয়ে খোয়া তৈরিসহ প্রকল্প কাজে নানান অনিয়মের চিত্র উঠে আসে। টেন্ডার শর্ত ভেঙে প্রকল্প কাজে ৫০ মিলি সাইজের খোয়া ধরা থাকলেও অধিকাংশ ইটের খোয়া তার চেয়ে বড় সাইজের। এছাড়া কার্পেটিংয়ের কাজ ৭৫ মিলি ধরা থাকলেও কোথাও ৬০ মিলি থেকে সর্বোচ্চ ৬৫ মিলি করা হয়েছে। যান চলাচলের আগেই উঠে যাচ্ছে কার্পেটিং। সেসময় স্থানীয়রা সাববেজের মান নিয়ে নানান অভিযোগ করেন।
বিসিকের একটি সূত্র জানায়, ২০২০- ২০২১ অর্থ বছরে ড্রেন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান আতাউর রহমান খান ও রাস্তা নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান মজিদ সন্স লিঃ নির্দিষ্ট সময়ে কাজ বাস্তবায়ন না করলে প্রায় ২০ কোটি টাকা জরিমানা করে বিসিক; যদিও তা আজও আদায় হয়নি। প্রকল্প এলাকায় আজও হয়নি ২০ কোটি টাকার বালু ভরাটের কাজ। নকসা অনুযায়ী গভীর না করায় লেকে পানি থাকছে না, এজন্য আজও ইজারা হয়নি। কাজগুলো নির্দিষ্ট সময়ে বাস্তবায়ন না হওয়ায় সরকারের প্রায় ২শ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে বলে সূত্র জানায়।
এর আগে শিল্প পার্কের সাবেক প্রকল্প পরিচালক জাফর বায়েজিদকে তদন্তের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, আমার জানা মতে আজ পর্যন্ত কোনো তদন্ত হয়নি। পরে বর্তমানে দায়িত্বরত বিসিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন তিনি।
যমুনা সেতুর পশ্চিম পাশে সিরাজগঞ্জের সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলী, পশ্চিম মোহনপুর, বনবাড়িয়া, বেলটিয়া ও মোরগ্রাম মৌজার অংশ নিয়ে প্রায় ৪০০ একর জমিতে বিসিক শিল্পপার্কটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কয়েক দফায় সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি করতে করতে সর্বশেষ প্রকল্প ব্যয় ধরা হয় ৭১৯ কোটি ২১ লক্ষ টাকা। শিল্প পার্কের ৮২৯টি প্লটে কমপক্ষে ৫৭০টি শিল্প কারখানা স্থাপনের কথা রয়েছে।