ফুটবল কখনো কখনো এমন কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়, যেখানে হার-জিতের হিসাব ছাপিয়ে যায় প্রত্যাবর্তনের গল্প। যখন স্বপ্নের আকাশে কালো মেঘ জমে, যখন পরাজয়ের ছায়া ধীরে ধীরে গ্রাস করতে থাকে পুরো দলকে, তখনই জন্ম নেয় বীরত্বের নতুন কাব্য। আর সেই কাব্যের নায়ক হতে হয় তাদেরই, যারা শেষ বাঁশি বাজার আগ পর্যন্ত বিশ্বাস হারায় না।
মিশরের দুই গোলের ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়া মুহূর্তে মনে হয়েছিল, আর্জেন্টিনার পথ বুঝি থেমেই গেল। নীল-সাদা জার্সির কোটি সমর্থকের চোখে তখন জমেছিল হতাশার অন্ধকার। কিন্তু এই দল যে হার মানতে শেখেনি, তা আবারও প্রমাণ করল লিওনেল মেসিরা। অসম্ভবকে সম্ভব করার দৃঢ়তা, ফিরে আসার অদম্য ইচ্ছা আর জয়ের ক্ষুধায় ম্যাচের গতিপথই বদলে দিল বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। শেষ পযন্ত ম্যাচের ফল ৩-২।
যে ম্যাচ একসময় মিশরের উৎসবের মঞ্চ হতে যাচ্ছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠল আর্জেন্টিনার প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্য। হাতের মুঠোয় থাকা জয় যখন ফসকে যায়, তখন প্রতিপক্ষের জন্য থাকে শুধু আক্ষেপ, আর আর্জেন্টিনার জন্য লেখা হয় নতুন এক লড়াইয়ের গল্প। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট হাতে নিয়ে মেসির স্বপ্নের যাত্রাও বেঁচে থাকল, বেঁচে থাকল বিশ্বকাপ জয়ের সেই অমলিন প্রত্যাশা।
কারণ কিংবদন্তিদের গল্প কখনো সহজ পথে লেখা হয় না। সেখানে থাকে ঝড়, থাকে পরীক্ষা, থাকে অশ্রু। আর থাকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইতিহাস বদলে দেওয়ার সাহস। মেসি ও আর্জেন্টিনার সেই সাহসী প্রত্যাবর্তন আবারও মনে করিয়ে দিল-শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত কোনো গল্পের শেষ লেখা হয় না।
সুরে সুর মিলিয়ে, কণ্ঠে কণ্ঠে শুধুই একটাই গান, ‘ভামোস আর্জেন্টিনা।’
ম্যাচের ১৫ মিনিটে মিশর এগিয়ে যায় ইয়াসের ইব্রাহিমের গোলে। মারওয়ান আত্তিয়ার ক্রস থেকে হেড দিয়ে ইয়াসের আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের প্রথম গোল করেন। সমতা ফেরানোর সূবর্ণ সুযোগ আর্জেন্টিনা পেয়েছিল। কিন্তু মেসির পেনাল্টি মিসে প্রথমার্ধে তারা পিছিয়ে।
পিছিয়ে থেকে জয়ের রেকর্ড আর্জেন্টিনার খুব সামান্য। ২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকার পর ম্যাচটা ৪-০ গোলে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। ওই ম্যাচের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো ম্যাচে প্রথমার্ধ শেষে পিছিয়ে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপের পুরো ইতিহাসে আর্জেন্টিনার ঘুরে দাঁড়ানোর রেকর্ড ছিল কম। প্রথমার্ধ শেষে পিছিয়ে থাকা আগের ১০টি ম্যাচের মধ্যে আর্জেন্টিনা মাত্র একবারই হার এড়াতে পেরেছিল। বাকি ৯টিতেই হেরেছিল। এবার সেই ইতিহাস পাল্টে দেয় মেসির দল।

তবে ম্যাচে আবার ধাক্কা খায় তারা। ৬৭ মিনিটে মিশর আবার গোল করে। কাউন্টার অ্যাটাকে মোহাম্মদ সালাহ ও হাইসেম হাসানের বাড়ানো বল নিখুঁত শটে জালে পাঠান জিকো। এর আগে জিকোর একটি গোল রেফারি বাতিল করে ফাউলের অজুহাতে। যদিও তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে।
এর ১২ মিনিট পরই সব ওলট পালট হওয়া শুরু। মিশর বড় কিছুর স্বপ্নে বিভোর ছিল। কিন্তু তাদের স্বপ্ন ভেঙে যায় আর্জেন্টিনার শেষ মুহূর্তের দুর্দান্ত লড়াইয়ে। ৭৯ মিনিটে মেসির ক্রস থেকে বক্সের ভেতরে লাফিয়ে গোল করেন বদলি হিসেবে নামা ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। এর ৪ মিনিট ৯০ সেকেন্ড পর মেসির পা ছুঁয়ে আসে দ্বিতীয় গোল। বক্সের ভেতরে জটলা থেকে মেসির পায়ের নাগালে বল। সুযোগ পেয়েই শট নেন তিনি। মিসরের গোলরক্ষক মোস্তাফা শোবাইর বলে হাত ছোঁয়াতে পারলেও তা পুরোপুরি ঠেকাতে পারেননি। বল ক্রসবারের নিচের অংশে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। মেসির এবারের বিশ্বকাপের অষ্টম এবং সব মিলিয়ে ২১তম গোল।
এরপরই আসে মাহেন্দ্রক্ষণ। দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা দ্বিতীয় মিনিটে সাফল্যে উদ্ভাসিত হয় আর্জেন্টিনা। উল্লাসে ফেটে পড়ে আটালান্টা, বুয়েন্স আয়ার্স কিংবা ঢাকার শত অলিগলি, খোলা ময়দান। ২–০ গোলে পিছিয়ে থাকা আর্জেন্টিনা ম্যাচটাকে ৩-২ বানিয়ে ফেলল। লাওতারোর মার্তিনেজের ক্রসে ফাঁকায় থাকা এনজো ফার্নান্দেজ গোল করে আর্জেন্টিনাকে জিতিয়ে দেন।
শেষ বাঁশির পর মেসি কান্নায় ভেঙে পড়েন। নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে এসে এমন রুদ্ধদ্ধার মুহূর্তকে এলএম টেন যেন মানতেই পারেনি! কান্নাতেও মিশে ছিল আনন্দের রেশ।