কেন ব্রহ্মপুত্রের বালু ও জাফলংয়ের পাথর উধাও হয়

ছবি সংগৃহীত ।

কুড়িগ্রামের চিলমারী বন্দর। আগে প্রতিদিন শত শত ডিঙি নৌকায় ঝুড়ি নিয়ে শ্রমিকরা বালু তুলতেন। বাড়ি করার ভিটা উঁচু করতে দিঘি খনন করতে হতো। মানে বালু উত্তোলিত হতো ঠিকই, কিন্তু শ্রমিক লাগত শত শত। কিন্তু ২০০৯ সালে এমপি নির্বাচিত হন জাকির হোসেন। ব্রহ্মপুত্র খননের কথা বলে চিলমারী উপজেলার রমনার ব্যাঙমারা ঘাটেই বালু তোলার মেশিন বসান। পত্রিকায় সংবাদ হয় জাকির এমপির উদ্যোগে ব্রহ্মপুত্রের খনন শুরু। মাস ছয়েক পরে বন্যা আসে। ব্যাপক ভাঙনে ব্যাঙমারা ঘাট থেকে শুরু করে ভাটিতে তিস্তার সংগমস্থল পর্যন্ত ৩-৪ কিমি. এলাকাব্যাপী ৫-৬টি গ্রাম ব্রহ্মপুত্রের পেটে চলে যায়। চিলমারীজুড়ে হাহাকার শুরু হয়। তারপর আমরা গড়ে তুলি ভাঙনবিরোধী গণকমিটি। ফলে সরকার ব্রহ্মপুত্রের ডান তীর রক্ষা প্রকল্প হাতে নেয়। এবার সিসি ব্লক তৈরির বালু সংগ্রহের জন্য আবারও শুরু হয় বালু উত্তোলন। তখন ছিল ২-৩টি বাল্কহেড।

তারপর দেখতে দেখতে শখানেক বাল্কহেড। খোদ জাকির মন্ত্রীরই কয়েকটা। এরা প্রতিদিন শত শত টন বালু তুলত। গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন এটাকে শিল্পায়ন বলতেন। কারণ তার ভাগ্নে ও শালারা এই বালুর পয়েন্টগুলোর মালিক। একইভাবে সাংবাদিকদেরও বালুর পয়েন্ট ছিল। যে তরুণ সাংবাদিকরা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলেন, দালাল সাংবাদিক তাদের নামে ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের মামলা করেছিল। বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে মানববন্ধনের ডাক দিলে আওয়ামী লীগ নেতা ও চেয়ারম্যান মিলন বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মান্নান সরকার, রহমত মাস্টারকে অপমান করে ও মাইক আটকে রাখে।

হাইকোর্টের নির্দেশনায় কোথাও বালু তুললে দায়ী থাকবে ওই এলাকার ডিসি। আমরা এই নির্দেশনাকে ব্যবহার করে বালু উত্তোলন ঠেকিয়েছিলাম। এ ছাড়া গডফাদার শওকত আলী সরকার বীরবিক্রম ও তার জামাই জাকির মন্ত্রীর বিরোধ। একপক্ষ বালু তুললে আরেকপক্ষ অভিযোগ দিত। এ রকম আওয়ামী লীগের গ্রুপিংগুলোকে ব্যবহার করেও বালু উত্তোলন ঠেকিয়েছিলাম। এ ছাড়া বালু উত্তোলনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চাপও ছিল। তারা নিয়মিত বালু উত্তোলনের বিরুদ্ধে মানববন্ধনও করেছেন। সর্বোপরি হাসিনা যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছিল, সে কারণেও বালুদস্যুরা মাঝে মাঝে বিরত থাকত।

দুই.

তারপর ৫ আগস্ট এলো। হঠাৎ করে বালুর পয়েন্টগুলোর দখলদার পাল্টে গেল। হাট ও ঘাটের ইজারাদার পাল্টে গেল। যারা এতদিন বালুর বিরুদ্ধে কথা বলত, তারা হঠাৎ বালু উত্তোলনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া শুরু করল। নতুন করে প্রতিরোধহীনভাবে বালু উত্তোলন শুরু হলো। এনসিপি, বিএনপি নেতারা নেতৃত্বে থাকলেন। জামায়াতের লোকজন স্থানীয় না হওয়ায় তারা পিছিয়ে পড়লেন। বিএনপির হাইকমান্ড বালু উত্তোলনকারীদের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় তারাও পিছিয়ে আসে। কিন্তু বৈষম্যবিরোধীদের বাপ-চাচাদের ঠেকাবে কে?

তারপর একদিন আর্মি এসে বালু উত্তোলনকারীদের ধরে নিয়ে যায়। সেদিন থেকে চিলমারীতে বালু উত্তোলন বন্ধ। শোনা যায়, রেজোয়ানা হাসানের ফোনেই বন্ধ হয়েছে বালু উত্তোলন।

তিন.

সিলেটকে বলা হয় দেশের ‘পাথররাজ্য’। সীমান্ত দিয়ে বয়ে চলা পিয়াইন নদী পাথরের অন্যতম বড় উৎস।

সিলেটের নদী অঞ্চলের এই পাথরগুলো মূলত ভারতের পাহাড়ি অঞ্চলে ঝরনার স্রোতে বাংলাদেশে এসে পড়ে। যেহেতু স্রোতে ভেসে আসে তাই যুগ যুগ ধরে পাথর উত্তোলনের পরও এই অঞ্চলের পাথরের পরিমাণ কমেনি। শত শত লোক যারা প্রকৃতির সন্তান হিসেবে ছোট ছোট টুকরিতে সনাতন পদ্ধতিতে পাথর সংগ্রহ করতেন। তারা শ্রমিকও নন, মালিক নন। এতে পরিবেশের কোনো সমস্যা হতো না। পর্যটকরাও সৌন্দর্য উপভোগ করতেন, গরিব মানুষরাও দুটো টাকা পেতেন। একটা ভারসাম্যমূলক পরিস্থিতি।

একপর্যায়ে চলে বড় পুঁজি। আসে বিদ্যুৎ, আসে খনন যন্ত্র, বসে পাথর ভাঙার মেশিন। বদলে যায় ভোলাগঞ্জ। স্বাধীন পাথর উত্তোলনকারীরা হয়ে পড়েন শ্রমিক। মেশিনের শব্দে লাখ লাখ পর্যটক মুখ ফিরিয়ে নেন। পরিবেশবাদীদের চাপে ২০২০ সালে লীগ সরকার পাথর উত্তোলন বন্ধ ঘোষণা করে। বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করা হয়, মেশিনপত্র ভেঙে ফেলা হয়।

আবার জাফলং, ভোলাগঞ্জ পর্যটকের ভিড়ে মুখরিত হয়। স্থানীয়রা সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনও করতে থাকে। জীবন ও প্রকৃতি হাত ধরে চলতে শুরু করে।

ইউরুংকাশ নদী। এটি একটি আমাদের পিয়াইনের মতো সাদা পাথর নদী। চীনের দক্ষিণ শিনজিয়াংয়ের হোতান এলাকায় অবস্থিত, যেখানে নদী কুওনলুন পর্বতমালা থেকে উৎ?সারিত হয়ে উত্তরদিকে প্রবাহিত হয়। নদীর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৫০৪ কিমি.। এটি হোতান শহরের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অবশেষে তাখলামাকান মরুভূমিতে বিলীন হয়। নদীটির নাম এসেছে নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া হোয়াইট নেফ্রাইট জেড পাথর থেকে অর্থাৎ ‘হোয়াইট জেড রিভার’। এটিকে চীনের সবচেয়ে ধনী নদী বলা হয়।

এই নদী থেকে ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে জিনজিয়াং অঞ্চল ৪১ মিলিয়ন পর্যটক আকর্ষণ করেছিল এবং মোট পর্যটন রাজস্ব ছিল ৪৩.৭৪ বিলিয়ন ইউয়ান, যা প্রায় ৬.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

চার.

অভ্যুত্থানের পরপরই সিলেটে দেখলাম, পর্যটকদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় আলেমরা পর্যটকদের সরে যেতে অনুরোধ করছেন। সম্প্রতি মুফতি ফজলুল হক আমিনীর একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। সেখানে তিনি পাথর উত্তোলনের নিষেধাজ্ঞাকে ভারতীয় চাপ বলে উল্লেখ করেছেন। এই দুটি ঘটনায় সংযোগ টের পাওয়া যায়। ৫ আগস্টের পর বহুদলীয় লুটপাটে পিয়াইন নদী মরুভূমি হয়ে গেছে। বিএনপিকে ধন্যবাদ তারা দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। বাকি পার্টিগুলোর দলীয় প্রধানরাই যুক্ত মনে হচ্ছে। উপদেষ্টা রেজোয়ানা হাসানের গাড়িবহরেও হামলা করেছে পাথর ব্যবসায়ীরা। উপদেষ্টাকে স্থানীয় জনগণের সঙ্গে আলাপই করতে দেওয়া হয়নি। তবুও ফেসবুকে তাকেই আক্রমণ চলছে।

বলা হয়, সেই সরকারই সবচেয়ে ভালো যেটা একেবারেই শাসন করে না। অন্তর্বর্তী সরকার শক্ত হাতে শাসন করে না বলে কেউ কেউ ‘মব সরকার’ও বলছেন। কিন্তু এ রকম সরকারের জন্য জনগণকে যোগ্য হয়ে উঠতে হয়। আর জনগণকে যোগ্য করে তোলে ওই সরকারই।

নাহিদ হাসান : লেখক ও সংগঠক


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৭-১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাবির ক্লাস পরীক্ষা বন্ধ

মিথ্যা সংবাদ প্রকাশের প্রতিবাদে রৌমারীতে সংবাদ সম্মেলন

ভোলায় ১০০কোটি ডলারের চিনা বিনিয়োগে অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত

চুয়াডাঙ্গায় পুলিশ-ম্যাজিস্ট্রেসি কনফারেন্স: দ্রুত বিচার সম্পন্নের আহ্বান

জরুরি বৈঠকে পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা

বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি পেলেন হানিয়া আমির

রায়গঞ্জে ওয়ার্ড নির্বাচন পরিচালকদের নিয়ে শিক্ষা বৈঠক অনুষ্ঠিত

নুরকে প্রধান উপদেষ্টার ফোন, তদন্তের আশ্বাস

বিনামূল্যে এআই ও চাকরিমুখী প্রশিক্ষণ শুরু করছে গুগল

ভিপি নুরের সবশেষ পরিস্থিতি নিয়ে যা বললেন বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম

১০

টুকরো কাপড় থেকে দামি শাড়ি তৈরি করেন তিনি

১১

গা*জা হা*মলায় মুসলিম বিশ্বকে রুখে দাঁড়ানোর আহবান

১২