বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বেরিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি তাদের অন্যতম বড় দাতা দেশকে হারাল।
এক বছর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে ডব্লিউএইচও ছাড়ার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সংস্থাটিকে ‘অতিরিক্ত চীনঘেঁষা’ বলেও সমালোচনা করেছিলেন তিনি। খবর বিবিসি
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগ জানায়, মহামারি মোকাবিলায় ডব্লিউএইচওর কথিত ‘ব্যর্থ ব্যবস্থাপনা’, সংস্কারে অক্ষমতা এবং সদস্য দেশগুলোর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে ডব্লিউএইচও এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
সংস্থাটির মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রিয়েসুস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রত্যাহার শুধু আমেরিকার নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই ক্ষতিকর।
ডব্লিউএইচও তাদের বৈশ্বিক কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে জানায়, তারা পোলিও, এইচআইভি/এইডস, মাতৃমৃত্যু কমানো এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তিসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে কাজ করে আসছে।
মহামারির পর ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় একটি আন্তর্জাতিক মহামারি চুক্তি তৈরির উদ্যোগ নেয় ডব্লিউএইচওর সদস্য রাষ্ট্রগুলো। এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ মহামারি প্রতিরোধ, প্রস্তুতি এবং মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদার করা, পাশাপাশি টিকা ও ওষুধ আরও ন্যায্যভাবে ভাগাভাগি করা। গত বছরের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া সব সদস্য দেশ এই চুক্তিতে সম্মত হয়।
বিবিসি বলছে, ঐতিহ্যগতভাবে ডব্লিউএইচওর অন্যতম বড় দাতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য তারা কোনও চাঁদা দেয়নি। এতে সংস্থাটিকে বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়তে হয় এবং ব্যাপকসংখ্যক কর্মী ছাঁটাই করতে হয়।
ডব্লিউএইচওর আইনজীবীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২৬ কোটি ডলার বকেয়া পরিশোধের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে ওয়াশিংটন জানিয়েছে, তারা এই অর্থ পরিশোধের কোনও কারণ দেখছে না।
যুক্তরাষ্ট্র আরও জানায়, ডব্লিউএইচওতে তাদের সব সরকারি অর্থায়ন বন্ধ করা হয়েছে, জেনেভাভিত্তিক সদর দপ্তর ও বিশ্বের বিভিন্ন কার্যালয় থেকে মার্কিন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের ফিরিয়ে আনা হয়েছে এবং ডব্লিউএইচওর সঙ্গে যুক্ত শত শত কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘ডব্লিউএইচও আমেরিকার সব অবদানকে কলঙ্কিত করেছে এবং নষ্ট করেছে’। তারা অভিযোগ করেন, সংস্থাটি তাদের মূল লক্ষ্য থেকে সরে গিয়ে বারবার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কাজ করেছে, এমনকি জেনেভা সদর দপ্তরে থাকা মার্কিন পতাকাও ফেরত দেয়নি।
যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা অন্যান্য দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মাধ্যমে রোগ পর্যবেক্ষণ ও জীবাণু বিনিময় চালিয়ে যাবে। তবে এখন পর্যন্ত কোন কোন দেশের সঙ্গে এ ধরনের সম্পর্ক রয়েছে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি দেশটি।
এছাড়া পোলিও বা এইচআইভি দমনে বৈশ্বিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে কর্মকর্তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এনজিও ও ধর্মভিত্তিক সংগঠনের সঙ্গে অংশীদারিত্বে কাজ করবে। তবে এখনও কোনও ধরনের নির্দিষ্ট চুক্তির কথা জানাতে পারেননি তারা।
এছাড়া বার্ষিক বৈশ্বিক ফ্লু টিকা তৈরিতে তথ্য বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না সে বিষয়েও কর্মকর্তারা নিশ্চিত নন।
প্রসঙ্গত, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে প্রত্যাহারের আদেশে সই করার পর ডব্লিউএইচও এক বিবৃতিতে আশা প্রকাশ করেছিল, যুক্তরাষ্ট্র সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে। তারা বলেছিল, ডব্লিউএইচও ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে অসংখ্য প্রাণ বাঁচিয়েছে এবং আমেরিকানসহ বিশ্ববাসীকে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে রক্ষা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ফিরে এলে তা বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য উপকার বয়ে আনবে বলেও মন্তব্য করেছিল সংস্থাটি।
অবশ্য কোভিড-১৯ মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও সমালোচিত হয়েছে।
অনেক সরকার লকডাউন আরোপ করতে দেরি করেছে, নাগরিকদের প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, এই বিলম্বের কারণেই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।