সাকরাইন উৎসবে মেতেছে পুরান ঢাকা

পুরান ঢাকার তাঁতিবাজার, শাঁখারিবাজার, নারিন্দা ও গেন্ডারিয়াসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে সাকরাইনের আমেজ থাকে সবচেয়ে বেশি। সকাল থেকেই এসব এলাকার বাড়ির ছাদ, গলির মুখ কিংবা উঁচু ভবনের ওপর মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে।

পাশাপাশি ছাদে ঘুড়ি কাটাকাটির লড়াই, আকাশজুড়ে রঙিন ঘুড়ির মেলা আর চারদিকে 'ভোকাট্টা' শব্দের উন্মাদনা—পৌষের শেষ দিনে এভাবেই মহাসমারোহে সাকরাইন উৎসবে মেতেছে পুরান ঢাকা। সময়ের সঙ্গে উৎসবের ধরনে কিছুটা পরিবর্তন এলেও এর মূল আকর্ষণ আজও সেই ঘুড়ি ওড়ানোই। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে শত বছরের পুরনো এই লোকজ উৎসব পুরান ঢাকার অলিগলি, ছাদ আর আকাশে ফিরিয়ে আনে এক চিরায়ত ঐতিহ্যের আনন্দ।

২০২৬ সালের সাকরাইন উৎসবের সকাল থেকে এভাবেই পুরান ঢাকার শাঁখারিবাজার, লক্ষ্মীবাজার, নয়াবাজার ও তাঁতিবাজারের প্রতিটি বাড়ির ছাদে চলছে ঘুড়ি ওড়ানোর তুমুল প্রতিযোগিতা।

রং-বেরঙের ঘুড়িতে পুরান ঢাকার আকাশে যেন রঙের মেলা বসেছে। প্রতিবছর পৌষের শেষ দিনে উদযাপন হয় এ সাকরাইন বা পৌষ সংক্রান্তি উৎসব। এটি আদি ঢাকাইয়াদের পিঠাপুলি খাওয়া আর সামাজিক মেলবন্ধনের এক অনন্য উৎসব। ঐতিহাসিক তথ্যমতে, ১৭৪০ সালে মোগল আমলের নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের শাসনামলে এই ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসবটি আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে জনপ্রিয়তা পায়। মোগল আমলের সেই আভিজাত্য আজ গণমানুষের উৎসবে পরিণত হয়েছে। তবে ২০২৬ সালের এই উৎসবে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা।

এবার টিকিফাই’-এর মতো কিছু প্রতিষ্ঠান নারিন্দার পীরসাহেব বাড়ির গলির মতো সুনির্দিষ্ট স্থানে টিকিটভিত্তিক ‘সাকরাইন ফেস্ট ২০২৬’-এর আয়োজন করেছে। যেখানে ডিজে পার্টির বদলে ঐতিহ্যবাহী ঢাকাইয়া গান ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সাকরাইন ফেস্টের আয়োজক হাজী গণি মিয়া বলেন, ‘ঐতিহ্যবাহী ঢাকাইয়া গানের আসর তেমন দেখা যায় না এখন। সবাই ডিজে পার্টিতে ব্যাস্ত। আমার বয়স হয়েছে, তবুও চেষ্টা করেছি সাকরাইনে আগের সেই আমেজ ফিরিয়ে আনার। এ ছাড়া এবারই প্রথম বেশ কিছু স্থানীয় সংগঠন “হেরিটেজ ওয়াক” বা ঐতিহ্যের পদযাত্রার আয়োজন করেছে। যেখানে তারা পুরান ঢাকার অলিগলি ঘুরে সাকরাইনের ইতিহাস জানাচ্ছে। তাদের কণ্ঠে ভেসে আসছে প্লাস্টিক ও কেমিক্যাল মাঞ্জা বর্জন করি, কাগজের ঘুড়ি ওড়াই, এমন নানা কথা।’

উৎসবের আমেজ সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে সূত্রাপুর, গেন্ডারিয়া ও নারিন্দা এলাকায়। এখানকার ধূপখোলা মাঠ সংলগ্ন বাড়িগুলোর ছাদে সকাল থেকেই ছিল উপচে পড়া ভিড়।

গেন্ডারিয়ার প্রবীণ বাসিন্দা হাজী মকবুল হোসেন স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আগে ঘুড়ির লড়াই ছিল অনেক বেশি শৌখিন। সুতোয় সাবুদানার আঠা আর কাঁচের গুঁড়ো দিয়ে মাঞ্জা দেওয়া হতো। এখনকার আধুনিক প্রযুক্তিতে অনেক কিছু সহজ হলেও আগের সেই আবেগটা কিছুটা বদলেছে। সাকরাইন উপলক্ষে প্রতিটি বাড়িতেই তৈরি করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নকশি পিঠা, চিতই, পাটিসাপটা এবং দুধপুলি। পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে বড় ডেকচিতে রান্না করা হচ্ছে খিচুড়ি ও মাংস, যা আগত অতিথিদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া সাকরাইনের এক অলিখিত নিয়ম।

পুরান ঢাকার বাসিন্দারা জানান, এবার অনেক জায়গায় ডিজে বক্সের বদলে ঐতিহ্যবাহী ঢাকাইয়া বাদ্যযন্ত্র যেমন ঢোল ও করতালির ব্যবহার বেড়েছে। যা উৎসবকে আরও লোকজ রূপ দিচ্ছে। সন্ধ্যা নামতেই শুরু হয় সাকরাইনের দ্বিতীয় পর্ব। বাড়ির ছাদে ছাদে বাহারি লেজার শো আর মুখে কেরোসিন নিয়ে আগুনের ফুলকি ছোটানোর রোমাঞ্চকর ‘ফায়ার স্পিনিং’ উৎসবের পারদ বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। বনানী থেকে আসা নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী রিয়াদ বলেন, ‘বন্ধুর দাওয়াতে প্রতি বছর আসি। এবার দেখলাম আধুনিক ও ঐতিহ্যের এক দারুণ সমন্বয়। এমনকি অনেকে বড় বড় প্রজেক্টরে ছাদে বসে সাকরাইনের লাইভ স্ট্রিমিং করছে।’

সাকরাইনকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরতে আরবান স্টাডি গ্রুপের প্রধান নির্বাহী তাইমুর ইসলাম বলেন, ‘এটি ঢাকাবাসীর সামাজিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আমরা যদি সম্মিলিতভাবে বড় পরিসরে উৎসবটিকে ছড়িয়ে দিতে পারি এবং প্রশাসনের দেওয়া নিরাপত্তা বিধিনিষেধগুলো মেনে চলি, তবে এটি আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হয়ে উঠতে পারে।’

বেলা শেষে সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে পুরো আকাশ যখন হাজার হাজার আতশবাজির আলোয় ঝলমল করে ওঠে, তখন মনে হয় আধুনিকতা আর ঐতিহ্য হাত ধরাধরি করে টিকে আছে পুরান ঢাকার এই প্রাণের উৎসবে। হাজারো মানুষের পদচারণায় বুড়িগঙ্গার পাড় থেকে শুরু করে ধোলাইখাল পর্যন্ত বিস্তৃত এই উৎসব প্রমাণ করে যে, উৎসবের মাধ্যমেই বেঁচে থাকে একটি জাতির আসল পরিচয়।


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আগামীতে দেশটা কীভাবে চলবে, তার জন্য গণভোট: আলী রীয়াজ

শীত নিয়ে দুঃসংবাদ দিল আবহাওয়া অফিস

ভারতকে রুখে দিল বাংলাদেশ

সাকরাইন উৎসবে মেতেছে পুরান ঢাকা

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়ে এসেছে: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৪৪০ বাংলাদেশি বন্দিকে রাজকীয় ক্ষমা

চুয়াডাঙ্গায় সেনাবাহিনীর অভিযানে নিহত বিএনপি নেতার জানাযা সম্পন্ন

সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে অপরিকল্পিত মিনি স্টেডিয়াম,কোটি টাকা জলে

বাংলাদেশে ‘অন অ্যারাইভাল ভিসা’ আপাতত বন্ধ ঘোষণা

বৃহস্পতিবার আবারও ৩ মোড়ে কর্মসূচির ঘোষনা

১০

জাতীয় নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট

১১

বিশ্ববাজারে সর্বকালের সর্বোচ্চ দামে সোনা–রুপা

১২