একই সুরে বিদায়, শেষ গোলও পেনাল্টিতে; মেসি-রোনালদো-নেইমারের এক অদ্ভুত মিল!

একই সুরে বিদায়, শেষ গোলও পেনাল্টিতে; মেসি-রোনালদো-নেইমারের এক অদ্ভুত মিল!

ফুটবল মাঠে তারা ছিলেন তিনটি আলাদা গল্পের নাম। একজনের পায়ে ছিল জাদু, অন্যজনের পায়ে অবিশ্বাস্য ক্ষুধা, আরেকজনের পায়ে ছিল শৈল্পিক সৌন্দর্য। লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও নেইমার জুনিয়র- তিনজন মিলে বদলে দিয়েছিলেন আধুনিক ফুটবলের সংজ্ঞা।

কখনো প্রতিপক্ষের রক্ষণকে তছনছ করেছেন, কখনো ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে লিখেছেন নতুন ইতিহাস, আবার কখনো কোটি মানুষের রাত জাগার কারণ হয়েছেন। তাদের ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে ফুটবলের এক দীর্ঘ সময়।

অথচ সময়ের নিয়ম বড় নির্মম। যে পায়ে একসময় ফুটবলবিশ্ব কাঁপত, সেই পায়েই এখন বিদায়ের সুর। একসময় যাদের নাম শুনে প্রতিপক্ষের ঘুম হারাম হতো, তারাই ধীরে ধীরে তুলে রাখছেন জাতীয় দলের জার্সি। পাঁচ মাসের ব্যবধানে তিন মহাতারকার আন্তর্জাতিক ফুটবলে বিদায়ের ঘোষণা যেন একটি যুগের পরিসমাপ্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।

নেইমার, মেসি ও রোনালদো-তিনজনের পথচলা আলাদা হলেও তাদের বিদায়ের গল্পে মিলে গেছে অদ্ভুত এক সমীকরণ। জাতীয় দলের হয়ে শেষ গোলটি করেছেন তিনজনই পেনাল্টি থেকে।

শুরুটা নেইমারকে দিয়ে। ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে যার পায়ের কারুকাজে মুগ্ধ হয়েছে পুরো বিশ্ব, সেই নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়টাও যেন ছিল আবেগে মোড়ানো। বিশ্বকাপে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল করেছিলেন তিনি। কিন্তু তার সেই গোলও শেষ পর্যন্ত দলকে পরাজয়ের হাত থেকে বাঁচাতে পারেনি। ২৮ জুলাই জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দেন ব্রাজিলিয়ান এই তারকা। ব্রাজিলের হয়ে তার পথচলা থেমে যায়, তবে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে তার শৈল্পিক ফুটবল থেকে যায় অমলিন।


এরপর বিদায়ের তালিকায় নাম লেখান লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে যার প্রতিটি স্পর্শে ফুটবল হয়ে উঠত শিল্প, সেই মেসির বিদায়ও ছিল আবেগঘন। বিশ্বকাপের আরেকটি ফাইনালে উঠেও শিরোপা জিততে পারেননি তিনি। এমন আক্ষেপের গল্পের পর ৩১ আগস্ট জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।


যদিও দেশের মাটিতে বিদায়ী ম্যাচ খেলার সুযোগ পেয়েছেন। বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে অ্যাসিস্টের পাশাপাশি পেনাল্টি থেকে গোল করেন তিনি। জাতীয় দলের হয়ে শেষ গোলটিও তাই পেনাল্টিতে। যেন দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ দৃশ্যটুকুও নিজের মতো করে সাজিয়ে নিলেন আটবারের ব্যালন ডি'অরজয়ী এই ফুটবল জাদুকর।

সবশেষে সেই তালিকায় যুক্ত হলো ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর নাম। পর্তুগালের জার্সিতে যার উদ্‌যাপন ছিল আলাদা এক আবেগের নাম, যার গোলের ক্ষুধা কখনো বয়সের কাছে হার মানেনি, তিনিও জানিয়ে দিয়েছেন আন্তর্জাতিক ফুটবলে আর দেখা যাবে না তাকে।

৫ নভেম্বর জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছেন, এখন থেকে মনোযোগ থাকবে কেবল ক্লাব ফুটবলে। পর্তুগালের হয়ে তার শেষ গোলটিও এসেছে পেনাল্টি থেকে, নেশন্স লিগে। গোলের পর গোল করে যিনি জাতীয় দলকে বহুবার আনন্দে ভাসিয়েছেন, তার আন্তর্জাতিক অধ্যায়ের শেষ গোলটিও যেন একই সুরে বাঁধা।

তিনজন, তিনটি দেশ, তিন রকম ফুটবলদর্শন অথচ শেষ গোলের গল্পে কী অদ্ভুত মিল! নেইমার, মেসি ও রোনালদো তিনজনই জাতীয় দলের হয়ে নিজেদের শেষ গোলটি করেছেন স্পটকিক থেকে। ফুটবল যেন তাদের বিদায়ের মুহূর্তে একই চিত্রনাট্য লিখে রেখেছিল।

তবে তাদের অবদানকে কেবল গোল কিংবা শিরোপার পরিসংখ্যানে আটকে রাখা অন্যায় হবে। নেইমার ফুটবলকে উপহার দিয়েছেন নান্দনিকতা, ড্রিবলিং আর সৃজনশীলতার অনন্য প্রদর্শনী। ব্রাজিলের জার্সিতে তার পায়ের জাদু নতুন প্রজন্মকে শিখিয়েছে, ফুটবল শুধু জয়ের খেলা নয়, আনন্দেরও খেলা।

অন্যদিকে মেসি যেন ফুটবলের এক জীবন্ত শিল্পী। বল পায়ে তার গতির পরিবর্তন, নিখুঁত পাস, অবিশ্বাস্য গোল আর প্রতিপক্ষকে বোকা বানানোর ক্ষমতা তাকে নিয়ে গেছে কিংবদন্তির উচ্চতায়। আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর পাশাপাশি ক্লাব ফুটবলেও তিনি রেখে গেছেন অতুলনীয় স্বাক্ষর।

আর রোনালদো? তিনি যেন পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও অদম্য উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি। প্রতিকূলতাকে জয় করে নিজেকে বারবার নতুন করে গড়ার যে গল্প তিনি লিখেছেন, তা ফুটবলের বাইরেও কোটি মানুষের প্রেরণা। গোল করার ক্ষুধা, শারীরিক সক্ষমতা, নেতৃত্ব আর জয়ের মানসিকতায় তিনি হয়ে উঠেছেন এক অনন্য দৃষ্টান্ত। পর্তুগালকে ইউরো ও নেশন্স লিগ জেতানোর পথেও তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

একটা সময় ছিল, ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার বড় অংশজুড়েই থাকতেন এই তিনজন। কে সেরা, কার গোল বেশি, কার ড্রিবলিং অসাধারণ, কার শিরোপার সংখ্যা বেশি—এমন অসংখ্য বিতর্কে বিভক্ত ছিল ফুটবলবিশ্ব। অথচ সময়ের পরিক্রমায় সেই বিতর্কের চরিত্রই বদলে যাচ্ছে। এখন আর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াই নয়, বরং তাদের রেখে যাওয়া স্মৃতি উদ্‌যাপনের সময়।

তাদের বিদায়ে ফুটবলের আকাশে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা হয়তো নতুন তারকারা পূরণ করবেন নিজেদের আলোয়। কিন্তু একই সময়ে তিনজনের এমন প্রভাব, এমন জনপ্রিয়তা কিংবা এমন দীর্ঘস্থায়ী আধিপত্যের পুনরাবৃত্তি সহজ হবে না। কারণ, তারা শুধু নিজ নিজ দেশের প্রতিনিধিত্ব করেননি; তারা একটি প্রজন্মের ফুটবলীয় আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতির নাম হয়ে উঠেছিলেন।

একদিন হয়তো নতুন কোনো প্রজন্ম মেসি, রোনালদো কিংবা নেইমারের রেকর্ড ভাঙবে। নতুন কোনো তারকা মাঠ মাতাবেন, নতুন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা জন্ম নেবে। কিন্তু যে প্রজন্ম একই সময়ে এই তিন মহাতারকার ফুটবল দেখার সৌভাগ্য পেয়েছে, তাদের কাছে এই অধ্যায় চিরকাল বিশেষ হয়ে থাকবে।

ফুটবল চলবে, গোল হবে, নতুন নায়ক জন্ম নেবে। কিন্তু মেসির বাঁ পায়ের জাদু, রোনালদোর আকাশছোঁয়া উদ্‌যাপন কিংবা নেইমারের সেই নান্দনিক ড্রিবলিং।


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

প্রথাগত কূটনীতিতে রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়: শামা ওবায়েদ

১

দীপাবলির আমেজে পুত্রকে প্রকাশ্যে আনলেন ভিকি-ক্যাটরিনা

২

১২ বছর পর মাওলানা ফারুকী হত্যা মামলার আসামিদের বিচার শুরু

৩

চুয়াডাঙ্গায় শীত মৌসুমে ৮০ কোটি টাকার খেজুর গুড়-পাটালির বাণিজ্যের সম্ভাবনা

৪

রাণবীর কাপুরের ‘শেষ দশক’ মন্তব্যে অভিনয় ছাড়ার জল্পনায় অনুরাগীরা

৫

বাংলাদেশের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের লিড ১৬৬ রান, চাপে স্বাগতিকরা

৬

জনমনে আতঙ্ক ছড়াতে বাসে আগুন ও ককটেল বিস্ফোরণ, বলছে ডিএমপি

৭

৩৫ টাকা কেজিতে আমন ধান, ৪৯ টাকায় সিদ্ধ চাল কেনার সিদ্ধান্ত সরকারের

৮

দুর্নীতিতে ধ্বংস হয়েছে সমবায় সমিতি, আইন সংস্কারের আহ্বান রাষ্ট্রপতির

৯

পোল্যান্ডে পর্যটন এলাকায় বন্দুকধারী তরুণের তাণ্ডব, নিহত ৯

১০

মেডিকেল ও ডেন্টালে আবেদন ও পরীক্ষার তারিখ প্রকাশ

১১

নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিকের বই ছাপা প্রায় শেষ, মাধ্যমিকের বাকি বড় অংশ

১২
Copyright © www.bnews24.online
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।