বাংলাদেশে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধলেশ্বরী ইত্যাদি নদীর তীরে প্রায় ৮.৩ লাখ হেক্টর চর আছে। যার প্রায় ৫.২-৭.৯ লাখ হেক্টর চাষযোগ্য। এ দেশের চরাঞ্চলে প্রায় ৬৫ লাখ লোক বসবাস করেন। চরের জমিতে পুষ্টি উপাদান এবং জৈব পদার্থের ঘাটতি থাকে। বাংলাদেশে লবণাক্ততা মুক্ত চরাঞ্চলগুলো হলো কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, পাবনা, বাজশাহী, জামালপুর, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, চাঁদপুর। বন্যার পানি সরে যাওয়ার পর চরের জমিতে ফসল চাষ করা হয়। চরাঞ্চলের কৃষকেরা সাধারণত তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে স্থানীয় বিভিন্ন জাতের ফসল চাষ করেন।
বাংলাদেশে মসলা ফসল অত্যন্ত জনপ্রিয়। মূল ভূখণ্ডে চাষযোগ্য জমির স্বল্পতার কারণে মসলা ফসলের জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হচ্ছে না। এ দেশে পেঁয়াজ, রসুন, মরিচ, ধনিয়া, কালিজিরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মসলাজাতীয় ফসল। এসব মসলা ফসলের যথেষ্ট ঘাটতি আছে। জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে ক্রমবর্ধমান জনসখ্যার খাবার উৎপাদনে প্রতিকূল চরের ইকোসিস্টেমে বর্ণিত মসলা ফসলগুলোর ফলন এবং উৎপাদন উভয়ই বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ আছে। সে লক্ষ্যে টেকসই ফসল উৎপাদন এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য চরাঞ্চলে বর্ণিত ফসলের উন্নত জাত ও আধুনিক চাষ পদ্ধতির প্রয়োগ এবং একক ফসলসহ মিশ্র ফসলের চাষাবাদ আবশ্যক।
সংযুক্ত চরাঞ্চল উঁচু হয় এবং এতে বালু ও আগাছার পরিমাণ তুলনামূলক বেশি থাকে। কিন্তু পলির পরিমাণ কম থাকে। আগাম রোপণ বা বপনকৃত ফসল এবং মাঠে দীর্ঘস্থায়িত্বকাল বিশিষ্ট ফসল এ চরাঞ্চলের জন্য নির্বাচন করা হয়। এ ধরনের চরে মসলা ফসলের মধ্যে রসুন, পেঁয়াজ, মুড়িকাটা পেঁয়াজ (ছোট কন্দ রোপণ করে পেঁয়াজ উৎপাদন), মরিচ, সাধারণত একক বা মিশ্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়ে থাকে। অন্যদিকে দ্বীপ চরাঞ্চল নিচু হয় এবং তেমন একটা আগাছা থাকে না কিন্তু পলির পরিমাণ বেশি থাকে। বিলম্বে রোপণ বা বপনকৃত ফসল এবং মাঠে স্বল্প স্থায়িত্বকাল বিশিষ্ট ফসল এ চরাঞ্চলের জন্য নির্বাচন করা হয়। এ ধরনের চরাঞ্চলে সাধারণত পেঁয়াজ একক ফসল কিংবা পেঁয়াজের ভেতর কালিজিরা, ধনিয়া মিশ্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়।
মিশ্র ফসল
একই জমিতে একসঙ্গে দুই বা ততধিক প্রজাতির ফসল চাষ করার পদ্ধতিকে মিশ্র ফসল চাষ বলা হয়। ভূমি, শ্রম, পুষ্টি উপাদান, পানি, আলোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে মিশ্র ফসলের মাধ্যমে প্রতি একক জমি থেকে একক ফসলের তুলনায় মোট উৎপাদন, আয় এবং ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা যায়। তাছাড়া এ পদ্ধতিতে রোগ ও পোকার আক্রমণ কম হয় এবং ফসল চাষের সফলতা বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে চরাঞ্চলে ফসলের নিবিড়তা ১৪৫-১৬২%। পরিকল্পিত মিশ্র ফসল চাষের মাধ্যমে ফসলের নিবিড়তা অনেক বৃদ্ধি করা সম্ভব। অন্যদিকে একই জমিতে একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস অনুসরণ করে দুই ধরনের ফসল চাষের পদ্ধতিকে আন্তঃফসল চাষ বলা হয়। চরে সারি কিংবা ফালি পদ্ধতিতে আন্তঃফসল চাষ করা যায়।
পেঁয়াজের ভেতর কালিজিরা বা ধনিয়ার মিশ্র ফসল চাষ
দ্বীপ চরাঞ্চলে সরাসরি বীজ বপনকৃত পেঁয়াজের ভেতর কালিজিরা বা ধনিয়া অথবা পেঁয়াজের ভেতর কালিজিরা ও ধনিয়া উভয়ই একই সাথে মিশ্র ফসল হিসেবে চাষ করা হয়ে থাকে। পাওয়ার টিলার দিয়ে দুইবার চাষ ও মই দিয়ে জমি তৈরি করা হয়। শেষ চাষের সময় প্রাপ্যতা সাপেক্ষে পচা গোবর সার, বিঘাপ্রতি ৩৫ কেজি টিএসপি, ২৫ কেজি এমওপি, ২০ কেজি জিপসাম, ২-৩ কেজি দস্তা সার এবং ১-২ কেজি বোরন সার প্রয়োগ করা হয়। জমিতে রসের ঘাটতি থাকলে পানি দিয়ে সার প্রয়োগ করতে হয়। পেঁয়াজের ৩টি জাত যথা বারি পেঁয়াজ-১, বারি পেঁয়াজ-৪ এবং বারি পেঁয়াজ-৬ জাত চরে চাষের উপযোগী। তবে বারি পেঁয়াজ-৪ খুবই উন্নত জাত। কালিজিরা ও ধনিয়ার উন্নত জাত হলো যথাক্রমে বারি কালিজিরা-১ ও বারি ধনিয়া-২। ডিসেম্বর মাসে পেঁয়াজ (৮০০-১০০০ গ্রাম/বিঘা), ধনিয়া (১.০-১.৫ কেজি/বিঘা) এবং কালিজিরার (৮০০-১০০০ গ্রাম/বিঘা) বীজ একই সাথে বপন করা হয়। পেঁয়াজের ভেতর ধনিয়া ও কালিজিরা উভয়ই একই সাথে মিশ্র ফসল চাষ করলে ধনিয়া ও কালিজিরার বীজ হার অর্ধেক করে হবে। পরে বালু দিয়ে বীজ ঢেকে দেওয়া হয়। পেঁয়াজ বীজ বপনের আগে প্রতি কেজি বীজ ২ গ্রাম প্রোভ্যাক্স ছত্রাকনাশকের মাধ্যমে শোধন করে নিতে হবে। ধনিয়া বীজ পানিতে ২৪-৪৮ ঘণ্টা ভিজিয়ে এবং পরে শুকিয়ে বপন করতে হয়।
কালিজিরা বপনের আগে বীজ কমপক্ষে ২ দিন রোদে শুকিয়ে এবং ঠান্ডা করে পরে ১০-১২ ঘণ্টা পানিতে ভেজাতে হবে। পরে প্রতি কেজি বীজ ২ গ্রাম প্রোভ্যাক্স ছত্রাকনাশকের মাধ্যমে শোধন করে নিতে হবে। শোধনকৃত বীজ রোদে শুকিয়ে ঝুরঝুরা করে বপন করতে হবে। অনেক চরাঞ্চলে কৃষক চাষ না দিয়েই বীজ বপন করে থাকে। বীজ বপনের ২০-২৫ দিন পর পানি সেচ দিয়ে বিঘাপ্রতি ১৫-২০ কেজি ইউরিয়া সার দিতে হয়। বপনের ৪০-৪৫ দিন পর আগাছা পরিষ্কার করে পানি দেওয়া হয় এবং পুনরায় ১৫-২০ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগ করা হয়। বপনের ৬০-৭০ দিন পর পুনরায় আগাছা নিড়িয়ে ও সেচ দিয়ে ১৫-২০ কেজি ইউরিয়া সার দেওয়া হয়। রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য লুনা সেন্সেশন (১ মিলি/লিটার পানি)/রোভরাল (২ গ্রাম/লিটার পানি)/এমিস্টার টপ (১ মিলি/লিটার পানি) ১৫ দিন পর পর পর্যায়ক্রমে স্প্রে করতে হবে। থ্রিপস দমনের জন্য সাকসেস/ইমিটাফ (১ মিলি/লিটার পানি) স্প্রে করতে হবে।
অনেক কৃষক জমিতে প্রায় ২৫-৩০% ধনিয়া রেখে বাকিটা তুলে বাজারে বিক্রি করে থাকে। আবার অনেক কৃষক ধনিয়া ও কালিজিরার বীজ হারের এক-তৃতীয়াংশ বপন করেন। অনেক কৃষক বিভিন্ন জমির সীমানায়, রসুন, ধনিয়া, কালিজিরা করে থাকেন। মার্চ মাসের শেষ থেকে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পেঁয়াজ সংগ্রহ করা হয়। পেঁয়াজ সংগ্রহের ১৫-২০ দিন আগে ধনিয়া ও কালিজিরার বীজ সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। তবে ধনিয়া পাতা বপনের ১.০-১.৫ মাসের মধ্যে সংগ্রহ করা হয়। পেঁয়াজের ফলন জাতভেদে ২.০-২.৫ টন/বিঘা। কালিজিরা ফলন বিঘাপ্রতি ১২০-১৪০ কেজি এবং ধনিয়ার ফলন বিঘাপ্রতি ১৫০-২০০ কেজি (বীজ) ও ৫০০-৭০০ কেজি (কাঁচা পাতা)।
এভাবেই প্রকৃতির সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করে মিশ্র ফসলের মাধ্যমে প্রতি একক জমি থেকে একক ফসলের তুলনায় মোট উৎপাদন, আয় এবং ফসলের নিবিড়তা বৃদ্ধি করা যায়। ফলে চরের ইকোসিস্টেমে বর্ণিত মসলা
ড. মো. ফোরকান আলী , গবেষক ও সাবেক অধ্যক্ষ