গত বছরের নির্বাচনকে ঘিরে ছয় মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারে সেনাবাহিনীর হাতে ৭০০ জনেরও বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘের নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান হামলা, নির্বিচার আক্রমণ এবং সহিংসতার কারণে দেশটির মানবিক সংকট আরও গভীর হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় দুর্ভোগ বেড়েছে লাখো মানুষের।
সংবাদমাধ্যম বিবিসি বলছে, গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত নতুন এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে অন্তত ৭০২ জন নিহত হওয়ার তথ্য যাচাই করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ২২৪ জন নারী ও ১৫৩ জন শিশু রয়েছে।
প্রতিবেদনটি গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কাল নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। এই সময়েই ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা সেনাবাহিনী নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেয়। তবে প্রধান বিরোধী দলগুলোকে নির্বাচনের বাইরে রাখায় নির্বাচন প্রক্রিয়াটিকে অনেকেই প্রহসন বলে আখ্যা দেন।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক সহায়তা কমে যাওয়ায় দেশটির কোটি মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ২০২১ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। এর পরই দেশটিতে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় এবং এতে হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিমান হামলাই এখনও ধ্বংসযজ্ঞ ও মানবিক দুর্ভোগের সবচেয়ে বড় কারণ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাগাইং অঞ্চল ছিল বেসামরিক মানুষের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা। সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সেনাবাহিনীর অভিযানের কারণে ১৯১ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৬০ জন নারী ও ৩০ জন শিশু।
গত বছরের অক্টোবরে সাগাইংয়ের চাউং-ইউ এলাকায় একটি স্কুলের সামনে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর গোলাবর্ষণে ২৩ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে চারজন শিশু ছিল। এ ঘটনায় আরও ৬০ জনের বেশি মানুষ আহত হন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলার সময় সেখানে উপস্থিত লোকজন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের উপবাসকাল সমাপ্তি উপলক্ষে মোমবাতি প্রজ্বালনের অনুষ্ঠান করছিলেন। একই সঙ্গে তারা রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি, বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগের বিরোধিতা এবং সামরিক সরকারের নির্বাচনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কথাও জানাচ্ছিলেন।
এরপর ডিসেম্বরে সাগাইংয়ের তাবায়িন এলাকায় একটি চায়ের দোকানে বিমান হামলা চালানো হয়। ফুটবল খেলা দেখতে সেখানে জড়ো হওয়া মানুষের ওপর চালানো ওই হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত এবং আরও ২০ জন আহত হন।
প্রতিবেদনে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আরাকান আর্মির জোরপূর্বক সদস্য সংগ্রহের পাশাপাশি রোহিঙ্গারা হত্যা, নির্বিচার গ্রেপ্তার এবং যৌন সহিংসতারও শিকার হয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার টুর্ক বলেন, ‘মিয়ানমারের জনগণ সেনাবাহিনীর হাতে ব্যাপকভাবে দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। এখন মনে হচ্ছে দেশের বাইরের বিশ্বও তাদের ভুলে গেছে।’
প্রসঙ্গত, পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখল করে এবং দেশটির নেতা অং সান সু চিকে কারাগারে পাঠায়। দুই বছরেরও বেশি সময় আগে বিদ্রোহীরা বড় ধরনের অগ্রগতি অর্জন করে বলে খবর পাওয়া গেলেও পরে তারা চাপের মুখে পড়ে যায়। বাধ্যতামূলক সেনা নিয়োগ এবং ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে বর্তমানে দেশের অধিকাংশ এলাকায় সেনাবাহিনী আবারও আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে।
এরপর চণতি বছরের এপ্রিল মাসে অভ্যুত্থানের নেতৃত্বদানকারী জেনারেল মিন অং হ্লাইং দেশটির প্রেসিডেন্ট হন।
অন্যদিকে মিয়ানমারে ওয নির্বাচনের আয়োজন করা হয় তার ফল অনেকটা আগেই অনুমিত ছিল। জনপ্রিয় অনেক রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিরত রাখা হয় এবং গৃহযুদ্ধের কারণে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ ভোটদান করতে পারেনি।
এছাড়া পার্লামেন্টে মিন অং হ্লাইংয়ের অনুগতদের আধিপত্য রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এক-চতুর্থাংশ আসন সংরক্ষিত। বাকি আসনগুলোর মধ্যে সেনাবাহিনী-সমর্থিত ইউএসডিপি দল প্রায় ৮০ শতাংশ আসন জিতেছে। সমালোচকদের মতে, পুরো নির্বাচনই ওই দলটির পক্ষে একতরফাভাবে সাজানো ছিল।