অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেড় বছরের শাসনামলে কিভাবে অবৈধ ও অসাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণের নানা উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে মুখ খুলেছেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন।
গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে নিজ কার্যালয়ে কালের কণ্ঠকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দের চাপ থেকেই মূলত এ উদ্যোগের সূত্রপাত। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয় এবং একপর্যায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও একটি অবস্থানে পৌঁছায়। সে অবস্থান ছিল, রাজনৈতিক দলগুলো যদি সর্বসম্মতভাবে রাষ্ট্রপতির অপসারণ চায়, তবেই তা সম্ভব; অন্যথায় নয়।
রাষ্ট্রপতি বলেন, এই ইস্যুতে রাজনৈতিক অঙ্গনে দ্রুতই বিভাজন তৈরি হয়। একাধিক গ্রুপ গড়ে ওঠে, গ্রুপে গ্রুপে বৈঠক হয়, আলোচনা চলে।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, এই উদ্যোগের নেপথ্যে যারা সক্রিয় ছিল, তারা প্রথমে জামায়াতের কাছে যায়, এরপর বিএনপি এবং বিএনপি জোটভুক্ত ছোট ছোট দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে। সে সময় জামায়াতের নিজস্ব কোনো আলাদা জোট না থাকলেও ইসলামী আন্দোলন, জামায়াত, খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন ইসলামী দলের কাছে তারা আলাদাভাবে ধরনা দেয়।
রাষ্ট্রপতি জানান, সে সময় এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে যেকোনো মুহূর্তে সংখ্যাগরিষ্ঠতা তৈরি হলেই তাঁকে অপসারণ করা হতে পারত, অথবা অন্তত মানসিকভাবে ভেঙে দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা হতো।
তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি ও তাদের জোটের অবস্থানের কারণে সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। রাষ্ট্রপতির মতে, যেহেতু বিএনপি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক দল, তারা যে অবস্থান নেয়, সেটিকে সরকারও সমর্থন করতে বাধ্য হয়। ফলে তাঁকে অপসারণের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রচেষ্টা সেখানেই থেমে যায়।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, সেটিই ছিল তাঁকে অপসারণের সবচেয়ে বড় ‘মুভ’। উদ্যোক্তারা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, তারা বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করেই ছাড়বে। সে কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বসা, নিয়মিত বৈঠক করা, সময় দিয়ে আলোচনা চালানো-সবকিছুই করা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে।
বিভিন্ন দলের সঙ্গে কথা বলে বেরিয়ে এসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়া, বক্তব্য দেওয়া-এসব তৎপরতা তখন নিয়মিতই চলছিল। রাষ্ট্রপতি নিজেও উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন।
তবে একপর্যায়ে পুরো বিষয়টি নীরব হয়ে যায় এবং আর এগোতে পারে না। তখনই তাঁর কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, এই উদ্যোগ সফল হবে না। বৃহত্তর একটি রাজনৈতিক দল এবং তাদের জোট দৃঢ়ভাবে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় রাষ্ট্রপতির পদে অন্য কাউকে বসানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।
তবে এখানেই অপসারণের চেষ্টা শেষ হয়নি বলে জানান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তাঁর ভাষায়, রাজনৈতিক পর্যায়ে ব্যর্থ হওয়ার পর শেষ সময় পর্যন্ত তাঁকে উপড়ে ফেলার চেষ্টা চালানো হয়েছে। রাজনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে খোদ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকেই নতুন করে পদক্ষেপ নেওয়া হয়। রাষ্ট্রপতি বলেন, আজ আর দ্বিধা নেই, একটি অসাংবিধানিক উপায়ে তৎকালীন প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতির স্থানে বসানোর চক্রান্ত করেছিল ইউনূস সরকার।
রাষ্ট্রপতি কালের কণ্ঠকে, বিষয়টি তিনি জানতে পারেন যে সরকারের পক্ষ থেকে একজন উপদেষ্টা তৎকালীন প্রধান বিচারপতির কাছে যান এবং তাঁর সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠক করেন। তবে প্রধান বিচারপতি সেই প্রস্তাবে রাজি হননি। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, তিনি নিজে একটি সাংবিধানিক পদে আসীন এবং রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন সাংবিধানিকভাবে সকলের ঊর্ধ্বে। সে কারণে অসাংবিধানিক কোনো প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রপতির স্থানে বসা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। প্রধান বিচারপতির এই দৃঢ় অবস্থানের কারণেই সরকারের ওই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় বলে জানান রাষ্ট্রপতি।
এই প্রেক্ষাপটে সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন রাষ্ট্রপতি। তাঁর মতে, একা তাঁর পক্ষে মনোবল অটুট রাখা কঠিন হতো, যদি না বিভিন্ন মহল থেকে আশ্বাস ও অভয়বাণী পেতেন। তিন বাহিনীর পক্ষ থেকে তিনি সর্বোচ্চ সমর্থন পেয়েছেন বলে জানান তিনি।
রাষ্ট্রপতির ভাষায়, সশস্ত্র বাহিনীপ্রধানরা তাঁকে বলেছিলেন- ‘মহামান্য, আপনি হচ্ছেন সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান। আপনার পরাজিত হওয়া মানে পুরো সশস্ত্র বাহিনীরই পরাজিত হওয়া। এটা আমরা যেকোনো মূল্যে রোধ করব।’ তিনি আরো বলেন, বিভিন্ন সময় সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা তাঁর কাছে এসে মনোবল জুগিয়েছেন।
এর আগে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের দাবিতে যে বিক্ষোভ হয়, তা নিয়ন্ত্রণে আনতেও ভূমিকা রাখে সেনাবাহিনী। রাষ্ট্রপতির ভাষায়, তখনও তিন বাহিনী প্রধানগণ তাঁকে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানকে জানিয়ে দেন, কোনো অসাংবিধানিক কর্মকাণ্ড তারা হতে দেবেন না।
এ ছাড়া বৃহত্তর রাজনৈতিক জোট হিসেবে বিএনপির সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সমর্থন পেয়েছেন বলে জানান রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। তিনি বলেন, বিএনপি শুরু থেকেই তাঁকে আশ্বস্ত করেছে যে তাঁরা অসাংবিধানিক উপায়ে রাষ্ট্রপতির অপসারণ চান না। এর ফলে রাষ্ট্রপতি অপসারণের শেষ চক্রান্তটিও ব্যর্থ হয়ে যায় বলে মনে করেন রাষ্ট্রপতি।