বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি আজ থেকে কার্যকারিতা হারিয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন না হওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বাতিল হওয়া ২০টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৭টি সংসদে বিলের মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছে এবং বাকি ১৩টি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদন না পাওয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে গেছে। এসবের মধ্যে গুম প্রতিরোধ, দুর্নীতি দমন কমিশন শক্তিশালী করা, পুলিশ কমিশন গঠন এবং মানবাধিকার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, সংসদে মোট ৯১টি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে ৮৭টি বিলের মাধ্যমে ১১৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদন করা হয় এবং ৪টি বিল দিয়ে ৭টি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়। তবে বাকি ১৩টি অধ্যাদেশের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় সেগুলো বাতিল হয়ে যায়।
বাতিল হওয়া অধ্যাদেশগুলোর মধ্যে রয়েছে- জাতীয় সংসদ সচিবালয় (অন্তর্বর্তী বিশেষ বিধান) অধ্যাদেশ ২০২৪, সুপ্রিম কোর্ট বিচারপতি নিয়োগ অধ্যাদেশ ২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৬ এবং ২০২৪-২০২৫ সালের মধ্যে জারি করা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত তিনটি অধ্যাদেশ।
বাতিল হওয়া ১৩টি অধ্যাদেশ হচ্ছে- ২০২৫ সালের রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দুটি, গণভোট অধ্যাদেশ, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত দুটি, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ।
৮৭টি বিলের মাধ্যমে ১১৩টি অধ্যাদেশ অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করা এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের দায়মুক্তি দেওয়ার মতো অধ্যাদেশও রয়েছে। শুধু শেষ দিনেই ২৪টি বিল পাস হয়েছে। এর আগে ৫ এপ্রিল দুটি, ৬ এপ্রিল সাতটি, ৭ এপ্রিল ১৪টি, ৮ এপ্রিল ১৩টি ও ৯ এপ্রিল ৩১টি বিল পাস হয়।
অধিবেশনের প্রথম দিন ১২ মার্চ আইনমন্ত্রী ১৩৩টি অধ্যাদেশই উপস্থাপন করেন, যা পরে পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ কমিটিতে পাঠানো হয়। ২ এপ্রিল কমিটির চেয়ারম্যান জয়নুল আবেদীন একটি প্রতিবেদন জমা দেন, যেখানে ৯৮টি অধ্যাদেশ অপরিবর্তিত রেখে অনুমোদন, ১৫টি সংশোধিত আকারে অনুমোদন, চারটি বাতিল এবং ১৬টি অধ্যাদেশ পরে আরও শক্তিশালী বিল হিসেবে পুনরায় পেশ করার সুপারিশ করা হয়।
যদিও কমিটি জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি) সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো নতুন বিল হিসেবে আনার সুপারিশ করেছিল, কিন্তু সংসদ সেগুলো বাতিল করে ২০০৯ সালের পুরোনো আইনটি পুনর্বহাল করেছে। একইভাবে কমিটি পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশটি সংশোধিত আকারে পাসের পরামর্শ দিলেও সেটি আর আনা হয়নি।
একই সাথে ২৪টি বিল পাস হয়। গতকাল পাস হওয়া ২৪টি বিল হলো- নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, বরিশাল উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল ২০২৬, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, আমানত সুরক্ষা বিল, আবগারি ও লবণ (সংশোধন) বিল, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (সংশোধন) বিল, বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন বিল ২০২৬, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বিল, ১৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় সংক্রান্ত আইন সংশোধন বিল, জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা বিল, সাইবার নিরাপত্তা বিল, গ্রামীণ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, বাংলাদেশ ব্যাংক (সংশোধন) বিল, মহেশখালী সমন্বিত উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিল, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) বিল, জুলাই গণঅভ্যুথ্থানের শহীদ পরিবারের ও আহত ছাত্র-নাগরিকদের কল্যাণ ও পুনর্বাসন বিল, ব্যাংক রেজোলিউশন বিল, অর্থ (২০২৫-২৬ অর্থবছর) বিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মারক জাদুঘর বিল এবং ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) বিল।
এ ঘটনায় বিরোধী দল সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও আস্থার সংকটের অভিযোগ তোলে। তাদের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ কিছু অধ্যাদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে পাস করা হয়নি। এর প্রতিবাদে বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে।
অন্যদিকে আইনমন্ত্রী জানান, সরকার সংবিধানের নিয়ম মেনেই কাজ করেছে। তিনি বলেন, কিছু অধ্যাদেশ আরও যাচাই-বাছাই শেষে ভবিষ্যতে নতুন করে আনা হতে পারে।