হান্টাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে আক্রান্ত একটি প্রমোদতরী এখন ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর পথে। ‘এমভি হন্ডিয়াস’ নামের জাহাজটিতে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। জাহাজটির তিনজন যাত্রীর শরীরে এই ভাইরাস নিশ্চিত হয়েছে, যাদের মধ্যে একজন মারা গেছেন। আরও পাঁচজনকে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে ২৩টি দেশের ১৪৬ জন যাত্রী ও নাবিক এখনও এমভি হন্ডিয়াসে অবস্থান করছেন। জাহাজটি ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের দিকে এগোচ্ছে, যেখানে পৌঁছানোর পর সবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। এরপরই তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরার অনুমতি দেওয়া হবে।
হান্টাভাইরাস (Hantavirus)
হান্টাভাইরাস হলো এক ধরনের ভাইরাস পরিবারের নাম, যা মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো হান্টাভাইরাস পালমোনারি সিনড্রোম (HPS) এবং হেমোরেজিক ফিভার উইথ রেনাল সিনড্রোম (HFRS)। সংক্রমণ গুরুতর হতে পারে, তবে যথাযথ সতর্কতা মেনে চললে ঝুঁকি অনেক কম থাকে।
সংক্রমণের কারণ ও বিস্তার
এই ভাইরাস মূলত কিছু নির্দিষ্ট সংক্রমিত ইঁদুরের মাধ্যমে মানুষের শরীরে ছড়ায়। ইঁদুরের প্রস্রাব, মল বা লালার মাধ্যমে ভাইরাস পরিবাহিত হয়। শুকনো মল বা প্রস্রাবের কণা বাতাসে মিশে শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণ হতে পারে। এছাড়া ক্ষতস্থানের মাধ্যমেও ভাইরাস শরীরে ঢুকতে পারে।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণ অত্যন্ত বিরল এবং সাধারণত উদ্বেগের কারণ নয়।
লক্ষণসমূহ (HPS)
ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ১ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সাধারণত এটি দুই ধাপে প্রকাশ পায়—
প্রাথমিক ধাপ (ফ্লু-এর মতো উপসর্গ)
উচ্চ জ্বর
কাঁপুনি
অতিরিক্ত দুর্বলতা ও ক্লান্তি
তীব্র পেশি ব্যথা (বিশেষ করে উরু, কোমর ও পিঠে)
মাথাব্যথা
মাথা ঘোরা
বমি বা ডায়রিয়া
পেটব্যথা
পরবর্তী ধাপ (শ্বাসকষ্টজনিত জটিলতা)
প্রাথমিক উপসর্গের ৪–১০ দিনের মধ্যে শুকনো কাশি ও তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। এ সময় ফুসফুসে তরল জমে রোগীর অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে উঠতে পারে।
রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা
দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ জরুরি: ইঁদুরের সংস্পর্শের পর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং সম্ভাব্য সংক্রমণের বিষয়টি চিকিৎসককে জানাতে হবে।
সহায়ক চিকিৎসা: বর্তমানে হান্টাভাইরাসের নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক বা অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। তাই রোগীর শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখতে অক্সিজেন থেরাপি বা আইসিইউতে ভেন্টিলেশন সাপোর্ট দেওয়া হয়।
প্রতিরোধের উপায়
বর্তমানে হান্টাভাইরাসের কোনো বাণিজ্যিক টিকা নেই। তাই প্রতিরোধই সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা।
বাড়িকে ইঁদুরমুক্ত রাখুন: ছোট গর্ত বা ফাঁকফোকর বন্ধ করুন যাতে ইঁদুর প্রবেশ করতে না পারে।
খাদ্য নিরাপদে সংরক্ষণ করুন: খাবার ঢাকনাযুক্ত পাত্রে রাখুন, ময়লা আবর্জনা ঢাকনাযুক্ত বিনে ফেলুন এবং ঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখুন।
নিরাপদ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখুন: ইঁদুরের মল বা প্রস্রাব শুকনো অবস্থায় ঝাড়ু বা ভ্যাকুয়াম করবেন না। এতে ভাইরাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। বরং জায়গাটি ৩০ মিনিট বাতাস চলাচলের জন্য খুলে রাখুন, এরপর জীবাণুনাশক বা ১০% ব্লিচ দ্রবণ স্প্রে করে টিস্যু বা কাগজ দিয়ে পরিষ্কার করুন। পরিষ্কারের সময় অবশ্যই রাবারের গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করুন।