আমাদের শৈশব কেটেছে এক সাধারণ গ্রামে। অন্য দশটি গ্রামের মতোই গ্রাম্য রাজনীতি ছিল, ভালো-মন্দের মিশেল ছিল, কিন্তু তবু সবার মাঝে ছিল এক গভীর বিশ্বাস আর সুরক্ষার অনুভুতি। জঙ্গলঘেরা আমাদের বাড়ি ছিল ছয় পরিবারের এক বিশাল রাজ্য। চারদিকে জঙ্গল আর মাঝখানে বাড়ি, তাই সবাই আমাদের বাড়িকে ডাকত 'মাঝেরবাড়ি'। প্রতিবেশীরাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তার দুর্গ।
পড়াশোনা আর চাকরির প্রয়োজনে আমি দেশের চারটা বিভাগে থেকেছি। নানা সামাজিক সংগঠনে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ আমার হয়েছে। এই অভিজ্ঞতায় আজ মনে হয় পুরো জেলা আমার এক বিস্তৃত পরিবার। সেখানে ধর্ম বা বর্ণ কোনোদিন দেয়াল তুলে বিভেদ তৈরি করতে পারেনি।
ছোটবেলায় দেখেছি মা-বাবা কোনো অনুষ্ঠানাদি গেলে নিশ্চিন্তে বাড়ি রেখে যেতেন, আমরাও নির্ভয়ে বাড়ি ও পাশের বাড়ি গিয়ে অন্যের হাঁড়ির খবর রাখতাম। সম্পর্কের সেই নিখাদ বিশ্বাস ও স্নেহ ছিল। সম্পর্কের সেকাল-একালের ব্যবধানে পরম আস্থার সেই চেনা মানুষগুলোই আজ ২০২৬ সালে এসে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে হাতগুলোর শিশুদের আগলে রাখার কথা ছিল, সেই অতি-পরিচিত হাতগুলোই কোথাও কোথাও সহিংস ও নির্মম হয়ে উঠছে। সামাজিক আস্থার এই ভাঙন আমাদের সমাজকে ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক শিশু হত্যা ও নির্যাতন চরম রূপ নিয়েছে। সামান্য লোভ বা ক্ষোভের বলি হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। আইফোনের জন্য কুমিল্লার অপ্রতীম, পল্লবীতে রামিসা, সিলেটে জেরিন এবং গাজীপুরে সামিউলকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এছাড়া মুক্তিপণের জন্য তানজিনা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে শিশু মিমকে হত্যা করা হয়েছে।
এসব নির্মম ঘটনা কেবল অপরাধের খবর নয়; এটি আমাদের সামাজিক আস্থার মুখোশ চুরমার করে দিয়েছে। যে নিকটাত্মীয় বা প্রতিবেশীর কাছে শিশুর নিরাপদ থাকার কথা ছিল, তাদের হাতেই আজ শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে। এটি আমাদের সমাজ কাঠামোর চূড়ান্ত অবক্ষয়ের রূপ।
আমাদের চেনা মানুষগুলো কেন এমন হিংস্র হয়ে উঠল? সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, সমাজে দুই ধরনের সামাজিক পুঁজি থাকে: একটি হলো আত্মীয়দের মধ্যকার টান, অন্যটি হলো সামাজিক পারস্পরিক শ্রদ্ধা। আজ দুটিই বিপর্যস্ত। মানুষ এখন অন্যকে কেবল প্রতিযোগী বা নিজের স্বার্থ উদ্ধারের হাতিয়ার মনে করে। বস্তুবাদের দৌড় মানুষকে দয়ামায়াহীন যন্ত্র বানিয়ে ফেলেছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের ওপর সংঘটিত নির্যাতনের ৮৩ শতাংশেরও বেশি ঘটায় তাদের অতি-পরিচিত মানুষরা। অপরাধবিজ্ঞানে এদের 'ট্রাস্টেড এডাল্টস' বা বিশ্বস্ত প্রাপ্তবয়স্ক বলা হয়। পরিচিত হওয়ার সুযোগে তারা শিশুর কাছাকাছি পৌঁছে যায় এবং ভীতি প্রদর্শন করে। এরা নিজেদের বিকৃতি মেটাতে পরিবারের সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় শিশুটিকে বেছে নেয়।
আধুনিক নগরজীবনে চারদেয়ালের খাঁচায় সন্তানদের আটকে রেখে আমরা ভাবি তারা নিরাপদ। কিন্তু ইন্টারনেটের মাধ্যমে বা ঘরের ভেতরেই তারা অন্যজগতে প্রবেশ করে, যেখানে অনেকগুলো দরজা তার জন্য খোলা থাকে যা শিশুর জন্য সম্পূর্ণ অচেনা ও অনিরাপদ। কেউ কেউ ঘরেই হয়তো অসৎ স্পর্শ বা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অভিভাবকেরা সেই নীরব সংকেতগুলো পড়তে ব্যর্থ হচ্ছেন। ঘরের দরজা বন্ধ করলেই সন্তান নিরাপদ হয় না, কারণ বিপদ অনেক সময় ঘরের ভেতরে বা ঠিক দরজার বাইরেই চেনা বেশে অপেক্ষা করে।
কেবল শোক প্রকাশ বা ফেসবুকে ফাঁসির দাবি তোলাই আমাদের শেষ দায়িত্ব হতে পারে না। আগামী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়তে আমাদের অভিভাবকত্ব বা প্যারেন্টিং-এর পুরনো ধারণা বদলাতে হবে। কুমিল্লার অপ্রতীমের অকাল মৃত্যু ঐতিহ্যবাহী অভিভাবকত্বকে আজ ব্যর্থ প্রমাণিত করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সমাজ সচেতন মা-বাবার এই অসহায়ত্ব, আমাদের আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে আজকের যুগে ভালো অভিভাবকত্ব মানে শুধু ভালো খাবার, দামি স্কুল বা হাতে গ্যাজেট তুলে দেওয়া নয়।
এর মূল শর্ত হলো সন্তানের মানসিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং ছদ্মবেশী বিপদ চিনতে শেখানো। গুড প্যারেন্টিংয়ে কিছু বিষয় আমলে নেওয়া জরুরি।
প্রথমেই আমাদের ‘বয়স্ক বা আত্মীয় মাত্রই পরম পূজনীয়’- এই অন্ধ বিশ্বাসের সামাজিক ভুল ধারণা ভাঙতে হবে। সন্তানকে শেখাতে হবে, পরিচিত বা রক্তের সম্পর্ক হলেও সবাই নিরাপদ না-ও হতে পারে। ছোটবেলা থেকেই শরীর ও 'পার্সোনাল বাউন্ডারি' সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। 'গুড টাচ' ও 'ব্যাড টাচ'-এর পার্থক্য শেখানো এখন বিলাসিতা নয়, জীবন বাঁচানোর মৌলিক পাঠ। পরিচিত কেউ অস্বস্তিকর আচরণ করলে শিশু যেন দৃঢ়ভাবে 'না' বলতে পারে এবং মা-বাবাকে জানাতে পারে।
আমাদের সমাজ শাসনের নামে সন্তানদের সাথে দূরত্ব তৈরি করে। সন্তান ভুল করলে বা অস্বস্তির কথা বললে তাকে বকা দেওয়া বা সন্দেহ করার প্রবণতা থাকে। ফলে শিশু কোনো স্বজন বা শিক্ষকের হাতে লাঞ্ছিত হলেও ভয়ে ঘরে কিছু বলে না। অপরাধীরা এই নীরবতার সুযোগ নেয়। তাই অভিভাবকদের নির্দেশের মানসিকতা ছেড়ে সন্তানের সবচেয়ে বড় বন্ধু হতে হবে।
প্রতিদিন সন্তানকে নিবিড় সময় দেওয়া, সারাদিনের কথা শোনা এবং তার আচরণের পরিবর্তন সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করা জরুরি। একই সাথে অপরাধীকে আড়াল করার নোংরা সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। চেনা কেউ অপরাধ করলে ‘মানসম্মানের ভয়ে’ বিষয়টি চেপে যাওয়ার প্রবণতা অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে। চেনা স্বজন হলেও অপরাধীকে আইনি ও সামাজিক শাস্তির মুখামুখি করতে হবে।
জাতীয় নীতিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেওয়া এখন সময়ের দাবি। প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক কাউন্সেলিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। স্কুলে নিয়মিত প্যারেন্টিং সেমিনার ও শিশু সুরক্ষা কর্মশালার আয়োজন করা উচিত, যাতে মা-বাবারা বৈজ্ঞানিক উপায়ে সন্তানকে আগলে রাখতে পারেন।
পরিবর্তনটা আমাদের নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হবে। সন্তানকে অন্ধ বিশ্বাসের অন্ধকার থেকে বের করে সচেতনতার আলোয় বড় করতে হবে। ঘরের পরিবেশকে করতে হবে ভয়হীন ও পরম আস্থার স্থান। আসুন, দূরদর্শী ও বিজ্ঞানসম্মত 'গুড প্যারেন্টিং'-এর মাধ্যমে শিশুদের এমন এক সমাজ নিশ্চিত করি, যেখানে স্নেহের ছদ্মবেশে কোনো দানব তাদের শৈশব কেড়ে নিতে সাহস পাবে না।
লেখক: সত্য সরকার, (উন্নয়ন ও গণমাধ্যমকর্মী) শিশু অধিকার কর্মকর্তা, মৌলভীবাজার জেলা
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় (পিভিএইচ