প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ফ্যাসিবাদের সময়কালের দুর্নীতি দুঃশাসনে পর্যুদস্ত একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল শাসন কাঠামো আর অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই হচ্ছে আমাদের সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সারা দেশে জুয়া ও মাদকের বিস্তারকেও বর্তমান সরকার আইন-শৃঙ্খলা অবনতির অন্যতম কারণ বলে চিহ্নিত করেছে। সুতরাং জুয়া ও মাদক নিয়ন্ত্রণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী সব রকম কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
জনজীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার সর্বোচ্চ উদ্যোগ গ্রহণ করছে। দেশের প্রতিটি সাংবিধানিক এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চলবে বিধিবদ্ধ নীতি নিয়মে। দলীয় কিংবা রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি অথবা জোর-জবরদস্তি নয়, আইনের শাসনই হবে রাষ্ট্র পরিচালনার শেষ কথা।’
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণের এক দিন পর গতকাল বুধবার রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘শুরুতেই মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করছি। হাজারো শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে পেরেছি। তাঁবেদারমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত জবাবদিহিমূলক একটি নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। দেশে গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার এই যাত্রালগ্নে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা এবং আন্তরিক অভিনন্দন জানাই।
স্বাধীনতাপ্রিয় গণতন্ত্রকামী জনগণের কারণেই দেশে আবার মানুষের অধিকার সম্মান এবং মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আমি দেশবাসীর উদ্দেশে একটি বার্তা দিতে চাই, মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান তথা দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী, এই দেশ আমাদের সবার। প্রতিটি নাগরিকের জন্যই এই দেশকে আমরা একটি নিরাপদ ভূমিতে পরিণত করতে চাই। একটি স্বনির্ভর নিরাপদ মানবিক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠাই বিএনপি সরকারের লক্ষ্য।’
দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে যেন না যায় সে জন্য ব্যবসায়ীদের সতর্ক থাকার আহবান : তারেক রহমান বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) থেকে সারা দেশে শুরু হতে যাচ্ছে পবিত্র মাহে রমজান।
আমি দেশবাসীকে পবিত্র মাহে রমজানের শুভেচ্ছা জানাই। রমজান আত্মশুদ্ধির মাস। আমরা যদি আত্মশুদ্ধি শব্দটির মর্মার্থ উপলব্ধি করি তাহলে এই মাসে মানুষের ভোগান্তি বাড়ার কথা নয়। যদিও আমাদের অনেকের মধ্যেই এই মাসটিকে ঘিরে ব্যবসায় অধিক মুনাফা লাভের প্রবণতা লক্ষণীয়। আপনাদের প্রতি আমার আহবান, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার স্বার্থে এই মাসটিকে আপনারা ব্যবসায় মুনাফা লাভের মাস হিসেবে পরিগণিত করবেন না।
দ্রব্যমূল্য যাতে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে না যায় এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা সতর্ক থাকবেন। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে একটি মাফিয়া সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার নিয়েই আমরা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। বিএনপি সরকার সব ক্ষেত্রেই অনাচার-অনিয়মের সব সিন্ডিকেটে ভেঙে দিতে বদ্ধপরিকর, ইনশাআল্লাহ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ক্ষুদ্র-মাঝারি কিংবা ছোট-বড়, সব ব্যবসায়ীর প্রতি বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি সহজ ও স্পষ্ট। বর্তমান সরকার ব্যবসায়ী এবং ক্রেতা সাধারণ উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করেই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চায়। সুতরাং সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করলে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে কিংবা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের স্বার্থ রক্ষা হবে, এ ব্যাপারে আপনাদের যেকোনো ধরনের পরামর্শ কিংবা অভিযোগ শুনতে সরকার প্রস্তুত। ক্রেতা-বিক্রেতা গ্রহীতা, এই সরকার সবার সরকার।
এই সরকার আপনাদের সরকার। আপনারাই ভোটের মাধ্যমে এই সরকারকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। আপনারাই এই সরকারের শক্তি।’
তিনি বলেন, ‘রমজান মাসে রোজাদারগণ বিশেষ করে ইফতার, তারাবিহ, সাহরি এই সময়গুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পেতে চান। এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দিয়েছি। অপচয় রোধ করে কৃচ্ছ্রতা সাধন প্রতিটি মুসলমানের ঈমানি দায়িত্ব। অফিস-আদালতে বিনা প্রয়োজনে কিংবা প্রয়োজনের অতিরিক্ত গ্যাস-বিদ্যুৎ-পানি খরচের ব্যাপারে সচেতনতা অবলম্বন করাও ইবাদতের অংশ।’
বিএনপি সরকার মহানবীর ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শ অনুসরণ করবে : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, “দেশের সব সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনসাধারণের প্রতি কৃজ্ঞতা জানানোর আগে আমি সরকারের মন্ত্রী এবং বিএনপির এমপিদের দিয়েই একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছি। বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভাতেই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, বিএনপি থেকে নির্বাচিত কোনো এমপি সরকারি সুবিধা নিয়ে ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি আমদানি করবেন না এবং প্লট সুবিধা নেবেন না। আমি আপনাদের সামনে বলেছিলাম, রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেলে বিএনপি সরকার মহানবীর ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শ অনুসরণ করবে। বিএনপির সংসদীয় দলের এসব সিদ্ধান্ত ‘ন্যায়পরায়ণতার’ আদর্শেরই প্রতিফলন।”
তিনি বলেন, ‘বিভাগীয় শহরগুলোতে বিশেষ করে রাজধানীর যানজট প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন। হাটে-মাঠে-ঘাটে, অফিস-আদালতে জনগণের ভোগান্তির শেষ নেই। জনজীবনের নানা ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ লাঘব করা না গেলে জনমনে স্বস্তি ফিরবে না। রাজধানীতে জনসংখ্যার চাপ কমাতে বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি হয়ে পড়েছে। মানুষ তার নিজ জেলায় কিংবা নিজের বাসা-বাড়িতে থেকেও যাতে সহজভাবে সঠিক সময়ে অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে, সে লক্ষ্যকে সামনে রেখেই সারা দেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রথমেই রেল নৌ সড়ক এবং সেতু মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম পুনর্বিন্যাস ও সমন্বয় করা হচ্ছে। সারা দেশে রেল যোগাযোগব্যবস্থার সহজসুলভ এবং নিরাপদ করা গেলে একদিকে যেমন জনগণের শহর-নগরকেন্দ্রিক নির্ভরতা কমবে, অপরদিকে পরিবেশেরও উন্নতি হবে।’
চারপাশে সমস্যার শেষ নেই উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনাও কিন্তু কম নয়। আমাদের বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে যদি আমরা দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত করতে পারি, তাহলে এই জনসংখ্যাই হবে আমাদের ‘জনসম্পদ’। আমরা নিজেদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারলে শুধু বাংলাদেশই নয়, বিশ্ব বাজারও আমাদের জন্য উন্মুক্ত। তথ্য-প্রযুক্তির সিঁড়ি বেয়ে বিশ্ব এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে প্রবেশ করেছে। প্রযুক্তির এই প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সম্মান এবং স্বচ্ছলতার সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাদের কোনো না কোনো একটি বিষয়ে বা কাজে পারদর্শী হতে হবে। দেশের কোটি কোটি শিক্ষার্থী এবং তরুণ যুবশক্তির উদ্দেশে বলতে চাই, মেধায় জ্ঞানে-বিজ্ঞানে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য যত রকমের সহযোগিতা দেওয়া যায়, সব রকমের সহযোগিতা দিতে বর্তমান সরকার প্রস্তুত। কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার নিয়ে বর্তমান সরকার যাত্রা শুরু করেছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর পর দেশে ফিরে গত বছর ২৫ ডিসেম্বর আমি বলেছিলাম, দেশ এবং জনগণের জন্য ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান’। ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে আমার ‘প্ল্যান পরিকল্পনা’র অনেক কিছুই আমি আপনাদের সামনে তুলে ধরেছিলাম।
আপনারা স্বাধীনতার ঘোষকের প্রতিষ্ঠিত দল বিএনপিকে ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছেন। সব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ দিয়েছেন। এখন এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সব অঙ্গীকার পূরণ করার দায়িত্ব বিএনপি সরকারের। আমরা আমাদের পরিকল্পনা এবং প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কাজ শুরু করে দিয়েছি, ইনশাআল্লাহ। অঙ্গীকার পূরণের এই যাত্রাপথে আমরা ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও আপনাদের অব্যাহত সমর্থন প্রত্যাশা করি।”
তারেক রহমান বলেন, ‘সরকারপ্রধান হিসেবে আমি দেশবাসীর উদ্দেশে একটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, নবগঠিত সরকার গঠনের সুযোগ দিতে যাঁরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছেন কিংবা দেননি অথবা কাউকেই ভোট দেননি, এই সরকারের প্রতি আপনাদের সবার অধিকার সমান।
বিএনপি সরকার বিশ্বাস করে, দল-মত-ধর্ম-দর্শন যার যার, রাষ্ট্র সবার। এই দেশে, এই রাষ্ট্রে একজন বাংলাদেশি হিসেবে, আপনার আমার আমাদের প্রতিটি বাংলাদেশি নাগরিকের অধিকার সমান। আল্লাহ আমাদের ইতিবাচক পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের তৌফিক দিন।’