শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারক নাভানেথেম ‘নাভি’ পিল্লাই। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিজয়ী হিসেবে তার নাম ঘোষণা করা হয়। ৮৫ বছর বয়সী পিল্লাই জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সাবেক প্রধান।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ওয়াতনে ফ্রাইডনেস জানান, শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় পিল্লাইয়ের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে এ সম্মান দেওয়া হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ এই পুরস্কার এ বছর ১২৫ বছরে পদার্পণ করেছে।
এবারের পুরস্কারের জন্য ২৮৭ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম মনোনয়ন পেয়েছিল। তাদের মধ্যে এক-চতুর্থাংশের কিছু বেশি ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে রাষ্ট্রপ্রধান, জাতীয় পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের পরিচালক, সাবেক নোবেল বিজয়ী এবং নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির সদস্যদের।
গত বছর ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা মারিয়া কোরিনা মাচাদো নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন। দেশটিতে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ভূমিকার জন্য তাকে এই সম্মান দেওয়া হয়। ক্রমবর্ধমান অন্ধকারের মধ্যেও গণতন্ত্রের আলো জ্বালিয়ে রাখার জন্য তার অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর মাচাদো তার নোবেল পদক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে দেন। ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, তার এই পুরস্কার পাওয়া উচিত। তবে নোবেল কমিটি স্পষ্ট করেছে, পুরস্কার হস্তান্তর করা যায় না। ফলে মাচাদোর পদক দেওয়ার ঘটনাটি ছিল প্রতীকী।
এ সপ্তাহের শুরুতে চিকিৎসাবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নে নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানে তিন বিজ্ঞানী পুরস্কার পেয়েছেন মস্তিষ্কের কার্যক্রম বুঝতে আলো ব্যবহার করে এমন একটি পদ্ধতি উদ্ভাবনে অবদানের জন্য। পদার্থবিজ্ঞানে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বিরল এক ধরনের নিউট্রিনোর রহস্য উন্মোচনে অবদান রাখা এক বিজ্ঞানীকে। আর অণুর দর্পণ-প্রতিচ্ছবির রহস্য উন্মোচনের জন্য রসায়নে পুরস্কার পেয়েছেন দুই বিজ্ঞানী। তাদের আবিষ্কার ব্যবহার করে অসংখ্য ওষুধ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন কানাডার কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক অ্যান কারসন। ধ্রুপদি ও আধুনিক সাহিত্যকে একত্র করা এবং কবিতা ও গদ্যের সীমারেখা অস্পষ্ট করে দেওয়া তার সাহসী ও উদ্ভাবনী কাজের জন্য তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার ঘোষণা করা হবে সোমবার।
এ বছর নোবেল পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা, যা প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলারের সমান। ব্যক্তি, ছোট কোনো দল কিংবা প্রতিষ্ঠান, যে-ই পুরস্কার পাক না কেন, অর্থের পরিমাণ একই থাকবে।
১৯০১ সালে চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১১২ জন ব্যক্তি ও ২৮টি পৃথক প্রতিষ্ঠান নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছে। রেড ক্রস তিনবার এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা দুবার এ পুরস্কার পেয়েছে। ব্যক্তিগত বিজয়ীদের মধ্যে নারী রয়েছেন মাত্র ২০ জন। তাদের মধ্যে আটজন গত ১৫ বছরে পুরস্কার পেয়েছেন।
সবচেয়ে কম বয়সে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার রেকর্ড মালালা ইউসুফজাইয়ের। শিক্ষা অধিকারকর্মী মালালা ২০১৪ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে এই সম্মান পান। দেশ হিসেবে সবচেয়ে বেশি পুরস্কার পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান, মোট ২৪টি। যুক্তরাজ্য পেয়েছে ১৩টি এবং সুইজারল্যান্ড ১১টি। তবে ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পুরস্কার পাওয়ার পর থেকে মার্কিন হিসেবে তালিকাভুক্ত আর কেউ নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি।
১৯ বার নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়নি, যার বেশির ভাগই দুই বিশ্বযুদ্ধের সময়। ১৯৪৮ সালে মহাত্মা গান্ধী নিহত হওয়ার বছরেও পুরস্কার দেওয়া হয়নি। গান্ধী ১২ বার মনোনয়ন পেলেও কখনো বিজয়ী হননি।
১৯৩৯ সালে সুইডেনের এক সংসদ সদস্য অ্যাডলফ হিটলারকে এ পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়েছিলেন। পরে তিনি মনোনয়ন প্রত্যাহার করে জানান, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে দেওয়া হয়নি।
তথ্যসূত্র : সিবিএস নিউজ।