চলতি বছরের ৭ জুন। বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি পথ ধরে মিয়ানমামারে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে দেশটির ৪৭ জন নাগরিককে। এরা রোহিঙ্গা নয়— বাংলাদেশ সীমান্তের ১৮ কিলোমিটার দূরে মিয়ানমারের চিন রাজ্যের পালেতোয়া অঞ্চলের খুমি জনগোষ্ঠী। অঞ্চলটিতে আরাকান আর্মির অত্যাচারের শিকার হয়ে তারা ৫ জুন সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ঢুকেছিলেন বান্দরবানে। দুদিন পর তাদের ফিরিয়ে দেয় বিজিবি। তবে, এই নিরস্ত্র খুমিরা নয়, বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মাথাব্যাথার কারণ সশস্ত্র খুমিরা।
আরাকান আর্মির হাত থেকে খুমি জনগোষ্ঠীকে রক্ষায় পালেতোয়া অঞ্চলের রাজনৈতিক সংগঠন খুমি ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি কেএনসিপি গড়ে তুলেছে তাদের সশস্ত্র শাখা; যার নাম ‘খুমি পিপলস ফোর্স (কেপিএফ)।’ সংগঠনটি সীমান্ত এলাকায় কার্যক্রম চালাচ্ছে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে। তৎপরতা আরও জোরদার করতে বাংলাদেশ সীমান্তের কাছে অবাধ চলাচলের অনুমতি চেয়ে গেল ২৫ মে বিজিবিকে চিঠি দিয়েছে সশস্ত্র সংগঠনটি। বাংলাদেশের জন্য হুমকি তৈরি না করে একটি সম্পর্ক স্থাপনের আকাঙ্ক্ষার কথা জানায় ওই চিঠিতে; যার কোনো জবাব দেয়নি বিজিবি। বরং, কোনো সশস্ত্র সংগঠনকে প্রশ্রয় না দিতে কঠোর অবস্থানে তারা।
প্রশ্ন হলো, সীমান্তের কাছে কোথায় কীভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে কেপিএফ? অনুসন্ধানের শুরু বান্দরবনের থানচি বাজার থেকে। স্থানীয়দের কাছে জানতে চাই কেপিএফ সম্পর্কে। তারা বলছেন, শুধু নাম শুনেছেন, দেখেননি কখনও।
কিন্তু, আমরা সরাসরি কথা বলতে চাই কেপিএফ সদস্যদের সঙ্গে। একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র ধরে আমাদের গন্তব্য সীমান্তের ৭২ পিলারের দিকে। যেখানে দেখা মিলবে সশস্ত্র সংগঠনটির।
ঘুটঘুটে অন্ধকারে থানচির সাঙ্গু নদীতে ঘণ্টাখানেকের যাত্রা। চারদিকে পাহাড়-জঙ্গলে অজানা আতঙ্ক। দুর্গম গিড়ি খাদ পেছনে ফেলে একদিন পর পৌঁছে যাই বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের সেই ৭২ পিলারের কাছাকাছি। সেখানে যেতেই চোখে পড়লে আরাকান আর্মির পরিত্যক্ত ক্যাম্প, যা ছেড়ে পালিয়েছে তারা। স্থানীয় একজনের মাধ্যমে অবশেষে আমরা মুখোমুখি তিন কেপিএফ সদস্যের। জানতে চাই, তারা কী কারণে আসতে চায় বাংলাদেশ সীমান্তে? ভাষান্তরের জন্য সহযোগিতা নিতে হয় একজন গাইডের।
কেপিএফ সদস্য জানায়, পালেতোয়া অঞ্চলে আরাকান আর্মির প্রভাব বাড়ার ছোট জাতিগোষ্ঠীগুলো বাঁচার জন্য অস্ত্র হাতে তুলে নিচ্ছে। তাদের দাবি, বাংলাদেশে প্রবেশ করবে না করে শুধু সীমান্ত রেখায় অবস্থান করবে কেপিএফ। তবে, কেপিএফ-এর তৎপরতা এত সরলরেখায় দেখতে রাজি নয় বিজিবি। কেননা, সীমান্তে বিদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর অদৃশ্য ঘাঁটি বা চলাচলপথ তৈরি করতে পারে নিরাপত্তা হুমকি।
সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আসা সব খুমি সশস্ত্র নয়। কিন্তু, সংঘাতের সুযোগে সশস্ত্র সদস্যরা মিশে যেতে পারে বেসামরিক মানুষের সঙ্গে। তাই সীমান্তের কঠোর নজরদারি চালাচ্ছে বিজিবি।