২০২৬ বিশ্বকাপ ফুটবল শুধু আরেকটি বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা নয়, বরং এক যুগের সমাপ্তির আবেগঘন মঞ্চ হয়ে উঠতে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই আসর ঘিরে যেমন নতুন ইতিহাসের অপেক্ষা, তেমনি বহু কিংবদন্তির বিদায়ের ছায়াও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবলের রঙ বদলে দেয়া একাধিক তারকা হয়তো শেষবারের মতো বিশ্বকাপের সবুজ গালিচায় নামবেন যেখানে জয়-পরাজয়ের পাশাপাশি আবেগই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় গল্প।
এই বিদায়ী সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা লিওনেল মেসি। ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে দেশকে শিরোপা এনে দিয়ে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন তিনি। এখন বয়স ৩৯ ছুঁইছুঁই, আর ইন্টার মায়ামিতে ক্লাব ক্যারিয়ার চালিয়ে গেলেও জাতীয় দলের জার্সিতে তার প্রভাব এখনো সমান উজ্জ্বল। তবু ২০২৬ বিশ্বকাপকে ঘিরে বারবারই শোনা যাচ্ছে এটাই হতে পারে মেসির শেষ বিশ্বমঞ্চ। উত্তর আমেরিকার ভিন্ন আবহাওয়া, দীর্ঘ ভ্রমণ আর ঘন সূচির চ্যালেঞ্জে তার ফিটনেস ধরে রাখা নিয়েও প্রশ্ন আছে। কিন্তু মেসির প্রতি ভক্তদের প্রত্যাশা একটাই শেষবারের মতো হলেও হয়তো তিনি ফিরিয়ে আনবেন সেই চিরচেনা জাদু।
একই অধ্যায়ের আরেক নাম পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পর্তুগালের এই সুপারস্টার ৪১ বছরে পা রেখে ২০২৬ বিশ্বকাপে নামলে সেটি হবে তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। সৌদি আরবের ক্লাব ফুটবলে এখনো নিয়মিত গোল করা রোনালদো বয়সকে যেন বারবার চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছেন। ফিটনেস, শৃঙ্খলা আর গোলের ক্ষুধা তাকে এখনো আলাদা করে রাখে। তবে প্রশ্ন একটাই ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়ে এসে তিনি কি পারবেন বিশ্বকাপ ট্রফির অপূর্ণ স্বপ্ন পূরণ করতে?
ব্রাজিলের তারকা নেইমারের গল্প আবার এক ভিন্ন বাস্তবতার। দীর্ঘ ইনজুরি আর অনিশ্চয়তার পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত জাতীয় দলে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। ২০২৩ সালের গুরুতর চোটের পর তার ক্যারিয়ার প্রায় থমকে গিয়েছিল। তবু হাল না ছেড়ে আবারও ফিরেছেন বিশ্বকাপ মঞ্চে। অনেকের ধারণা, ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে পারে ব্রাজিলের এই তারকার জন্য শেষ বড় সুযোগ এবং একই সঙ্গে দেশকে ষষ্ঠ শিরোপার পথে ফেরানোর এক স্বপ্নযাত্রা।
মেক্সিকোর অভিজ্ঞ গোলরক্ষক গুইলার্মো ওচোয়ার জন্যও এটি হতে পারে বিদায়ী বিশ্বকাপ। ৪০ বছর বয়সে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলার সম্ভাবনা নিয়ে তিনি আবারও প্রস্তুত। বিশ্বমঞ্চে বহুবার মেক্সিকোর রক্ষাকবচ হয়ে ওঠা ওচোয়া এবারও দলের অভিজ্ঞতার বড় ভরসা।
জার্মানির কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল ন্যুয়ার আন্তর্জাতিক ফুটবলের অবসর ভেঙে আবারও ফিরেছেন আলোচনায়। বয়স ৪০ হলেও তার রিফ্লেক্স ও নেতৃত্ব জার্মানিকে নতুন করে স্বপ্ন দেখাচ্ছে। কোচিং স্টাফের আস্থায় তিনি আবারও বড় মঞ্চে দলের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠতে পারেন।
ক্রোয়েশিয়ার মধ্যমাঠের কিংবদন্তি লুকা মদ্রিচের জন্যও ২০২৬ বিশ্বকাপ হতে পারে শেষ অধ্যায়। ২০১৮ বিশ্বকাপে দলকে ফাইনালে তোলার পেছনে তার ভূমিকা ছিল অনন্য। বয়স ৪০ হলেও তার পাসিং, দৃষ্টিভঙ্গি আর ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা এখনো বিশ্বমানের।
এই তালিকায় আরও আছেন মিশরের মোহামেদ সালাহ , সেনেগালের সাদিও মানে, বেলজিয়ামের কেভিন ডি ব্রুইনা, নেদারল্যান্ডসের ভার্জিল ভ্যান দাইক এবং কলম্বিয়ার জেমস রদ্রিগুয়েজ যাদের অনেকের জন্যই এটি হতে পারে শেষ বিশ্বকাপ। নিজেদের দেশের ইতিহাসে তারা সবাই হয়ে উঠেছেন প্রজন্মের অনুপ্রেরণা।
ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইনের ক্ষেত্রেও একই সম্ভাবনার কথা উঠছে। যদিও তিনি এখনো শীর্ষ ফর্মে আছেন, তবু বয়স এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপই হতে পারে তার শেষ বড় আন্তর্জাতিক মঞ্চ।
সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু নতুন তারকার উত্থানের গল্প নয়, বরং এক সোনালি প্রজন্মের বিদায়েরও আবেগঘন অধ্যায়। যে প্রজন্ম বিশ্ব ফুটবলকে দীর্ঘদিন ধরে আলোয় ভরিয়ে রেখেছে, তাদের শেষবারের মতো একসঙ্গে দেখা যাবে এই মঞ্চেই এমন প্রত্যাশায় মুখিয়ে থাকবে পুরো ফুটবল বিশ্ব।