বাংলাদেশে বিনিয়োগের মাধ্যমে জাপানি বিনিয়োগকারীরা ৩০০ কোটিরও বেশি ভোক্তার একটি বৃহৎ আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ পাবে বলে জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, দক্ষিণ এশিয়া ও আসিয়ানের সংযোগস্থলে বাংলাদেশের কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ শুধু সম্ভাবনাময় বিনিয়োগ গন্তব্য নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়া ও আসিয়ানের মধ্যে একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক সেতুবন্ধন।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) জাপানের ওসাকায় জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো), জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং ওসাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট প্রমোশন সেমিনারে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ববি হাজ্জাজ বলেন, বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির (ইপিএ) অগ্রগতি এবং জাপানের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। এসব উদ্যোগ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এবং জাপানি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করবে।
তিনি বলেন, জাপানের মেইজি পুনর্গঠন শিক্ষা, প্রযুক্তি, শিল্পায়ন ও দূরদর্শী নেতৃত্বের মাধ্যমে একটি জাতির রূপান্তরের অনুকরণীয় উদাহরণ। বাংলাদেশও জাপানের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, উৎপাদনশীলতা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যতের অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়।
প্রতিমন্ত্রী জানান, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ৫০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। দীর্ঘ সময় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের বেশি ছিল এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৫ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করা।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ৭ কোটির বেশি তরুণ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের অন্যতম বড় প্রতিযোগিতামূলক শক্তি। মাথাপিছু আয় ৩ হাজার মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ছে। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দুই দেশের যৌথ লক্ষ্য আগামী কয়েক বছরে এ বাণিজ্য ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত করা।
জাপানি বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে যন্ত্রপাতি ও লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, শিল্প উপাদান, অটোমোবাইল ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের (ইভি) যন্ত্রাংশ, ইলেকট্রনিক্স, ফার্মাসিউটিক্যালস, এপিআই ও চিকিৎসা সরঞ্জাম, বহুমুখী পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা, কোল্ড-চেইন লজিস্টিকস, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামো, শিল্পাঞ্চল উন্নয়ন, রোবটিক্স, শিক্ষা প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের কথা উল্লেখ করেন তিনি।
শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা ও মেডিকেল ট্যুরিজম খাতেও বাংলাদেশ ও জাপানের সহযোগিতার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। বাংলাদেশের তরুণ, শিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তি জাপানের ক্রমবর্ধমান শ্রমঘাটতি এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ববি হাজ্জাজ বলেন, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
বক্তব্যের শুরুতে জাপান সরকার, জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী, জেট্রো এবং ওসাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিকে সেমিনার আয়োজন ও বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদারে সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানান তিনি।
তিনি বলেন, জাইকারসহ বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক উদ্যোগের মাধ্যমে জাপান কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের অবকাঠামো, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে কাজ করে আসছে।
জাপানি ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির অভিযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ মানেই শুধু একটি দেশের বাজারে প্রবেশ নয়, বরং ৩০০ কোটিরও বেশি ভোক্তার একটি বিশাল আঞ্চলিক বাজারে প্রবেশের কৌশলগত সুযোগ।
সেমিনারে জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী, জেট্রো ও ওসাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, জাপানের হাউস অব কাউন্সিলরসের সদস্য ফুতোশি ওকাজাকি, সাইফার-কোর কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মোটোইউকি ওদাচি এবং জাপানের শতাধিক শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।