পহেলা বৈশাখ যেভাবে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠল

বাংলা নববর্ষ পহেলা বৈশাখ বাঙালি জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দিনটি শুধু নতুন বছরের সূচনা নয়, বরং এক নতুন অধ্যায়ের শুরু। এর মধ্য দিয়েই আসে নতুন সকাল, নতুন স্বপ্ন, নতুন সম্ভাবনা; গড়ে ওঠে প্রকৃতি-মানুষের মেলবন্ধন।

বৈশাখের উল্লেখ পাওয়া যায় প্রাচীন যুগে বিদুষী নারী ও জ্যোতির্বিদ খনার বচনেও। তার রচিত কৃষি, জ্যোতির্বিদ্যা ও আবহাওয়াভিত্তিক লোকছড়া অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যবর্তী সময়ে রচিত বলে ধারণা করা হয়।

‘মাঘে মুখী, ফালগুনে চুখি, চৈতে লতা, বৈশাখে পাতা’।

‘বৈশাখের প্রথম জলে, আশুধান দ্বিগুণ ফলে’।

এই অঞ্চলের কৃষকের জন্য বাংলা দিনপঞ্জির প্রথম মাস বৈশাখ কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার প্রমাণ পাওয়া যায় খনার বচন থেকেই। এখনো দেশের অনেক কৃষক বাংলা তারিখ অনুযায়ী বীজ বোনেন, ফসল কাটেন এবং জীবনঘনিষ্ঠ হিসাব-নিকাশ নির্ধারণ করেন।

বাংলা সনের প্রবর্তনে দুই মুসলিম শাসকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য—সুলতান হোসেন শাহ ও মোগল সম্রাট আকবর। তবে অধিকাংশ গবেষকের মতে, আকবরই বাংলা সনের প্রধান প্রবর্তক।

কৃষির সুবিধার্থে আকবরের নির্দেশনায় পণ্ডিত ফতেহ উল্লাহ সিরাজী সৌর সন ও আরবি হিজরি সালের সমন্বয়ে বাংলা সন প্রণয়ন করেন। প্রথমে এর নাম ছিল ‘ফসলি সন’; পরে তা ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা সন নামে পরিচিতি পায়।

কেউ কেউ মনে করেন, গৌড়েশ্বর রাজা শশাঙ্কের আমলেই বাংলা পঞ্জিকার সূচনা। তখন খাজনা আদায় হতো চন্দ্রবর্ষ অনুযায়ী, অথচ কৃষিকাজ নির্ভর করত সৌরবর্ষের ওপর।

ফলে চৈত্রের শেষ দিনে খাজনা পরিশোধের পর পহেলা বৈশাখে জমিদারেরা মিষ্টান্ন দিয়ে প্রজাদের আপ্যায়ন করতেন। সেখান থেকেই শুরু হয় নববর্ষ উদযাপনের প্রথা, যা ক্রমে সামাজিক উৎসবে রূপ নেয়।

আকবরের চালু করা ফসলি সনের এই রেওয়াজ ‘হালখাতা’ হিসেবেও পরিচিত। ফারসি শব্দযুগল ‘হালখাতা’ বলতে নতুন খাতা বোঝায়। এর মাধ্যমে সাধারণত পুরোনো খাতার পুরোনো হিসাব পরিশোধ করে নতুন খাতায় নতুন হিসাব তোলা হয়।

বলা যায়, বাঙালির আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বাংলা নববর্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। সমতলে যেমন নববর্ষ উদযাপিত হয়, তেমনি পার্বত্য চট্টগ্রামে ছোট ছোট জাতিগোষ্ঠীও এই দিনে ভিন্ন ভিন্ন আয়োজনের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে।

ত্রিপুরাদের কাছে বৈসুব বা বাইসু, মারমাদের কাছে সাংগ্রাই ও চাকমা-তঞ্চঙ্গ্যাদের কাছে বিজু নামে পরিচিত। এটিও তাদের বর্ষবরণ। এসব শব্দের আদ্যাক্ষর নিয়ে সংক্ষেপে এ একত্রে ‘বৈসাবি’ উৎসব বলা হয়।

১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের সমাপ্তি হলে এই অঞ্চলে সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসে। পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের শাসনের অধীনে গেলে প্রথম আঘাত আসে ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর।

ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হলেও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের কারণে পূর্ব বাংলার বাঙালির নিজস্ব ঐতিহ্যচেতনা প্রবল হয়ে ওঠে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলা নববর্ষ হয়ে ওঠে সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়ের এক শক্তিশালী প্রতীক।

১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠন করলে বাংলা নববর্ষকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপনের উদ্যোগের পাশাপাশি দিনটিকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করে। যদিও পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামরিক শাসনের কারণে এই উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত হয়। তবুও বাঙালির জাতীয় চেতনা দমে যায়নি।

১৯৫৪ সালের পহেলা বৈশাখের দিনে তৎকালীন পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা একে ফজলুল হক যে বাণী দিয়েছিলেন তাতে তিনি বলেন: ‘আজ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। এই উপলক্ষে আমি আমার একান্ত প্রিয় পূর্ব্ববঙ্গবাসীদিগকে জানাইতেছি আন্তরিক অভিনন্দন। আর তাহাদের পক্ষ হইতে পশ্চিম পাকিস্তানের ভ্রাতৃবৃন্দকে জানাইতেছি প্রীতি ও ভালোবাসা এবং বহির্ব্বিশ্বের জনসাধারণকে শুভেচ্ছা। নূতন পরিবেশে আমাদের যাত্রা হইল শুরু। পুরাতনকে পশ্চাতে ফেলিয়া নবযুগ প্রবর্ত্তনের সঙ্কল্প লইয়া আমরা নববর্ষে পদার্পণ করিলাম।’

সেই বছর ১৪ এপ্রিল দৈনিক আজাদে এই বাণী প্রকাশিত হয়।

ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে পূর্ববঙ্গে যে জাগরণ তৈরি হয়, তা ঢাকাকেন্দ্রিক বাঙালিত্বের ধারণাকে শক্তিশালী করে এবং এটি ক্রমে একটি উদার সাংস্কৃতিক পরিচয়ের রূপ নেয়। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই অন্তর্ভুক্ত। এই উদারতা নববর্ষ উদযাপনেও প্রতিফলিত হয়। বাংলা পঞ্জিকা সংস্কারের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে।

অধ্যাপক সৈয়দ আজিজুল হক এক প্রবন্ধে জানান—ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি বাংলা মাসের দিনসংখ্যা নির্ধারণসহ একটি সুসংহত কাঠামো তৈরি করে। পরে বাংলা একাডেমির উদ্যোগে ১৯৯৫ সালে সংস্কার কার্যকর হলে বঙ্গাব্দ ও খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে স্থায়ী সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্রজয়ন্তী ও নজরুলজয়ন্তী প্রতিবছর একই খ্রিষ্টীয় তারিখে উদযাপিত হচ্ছে।

১৯৫২ সালের ১৪ এপ্রিল দৈনিক আজাদের এক প্রতিবেদনে বলা হয়: ‘বাংলা তারিখ গণনাকে আমরা অনেকেই প্রায় ভুলে যেতে বসেছিলাম। ইংরাজের অধীনে থেকে থেকে ইংরেজি আদব কায়দা রফত করার সাথে সাথে আরও অনেক কারণে বাধ্য হয়েই ইংরেজি সনকে আমরা দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়েছিলাম।’

‘বাংলা সন মাস কালের অনুসন্ধান গ্রাম্য পণ্ডিতদের পাঁজি পুঁথির ভেতরেই প্রায় সীমাবদ্ধ হতে চলেছিল। কিন্তু এর পিছনে আমাদের যে অন্তরের যোগ, তা কিছুতেই মুছে যাবার নয়। মনের মাঝে উঁকি দেয় বাংলা মাসগুলোর আগমনবার্তা। কিন্তু নতুন বছর কেবল এই দিক দিয়েই নতুন নয়।’

এতে আরও বলা হয়: ‘বাংলা ইংরেজি যে কোনো মাসই হোক না কেন, তার প্রথম দিনটিতে আমাদের মনপ্রাণ ভরে দেয় নতুন উৎসাহ, নতুন উদ্দীপনা।’

পহেলা বৈশাখ বাঙালির জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। পৃথিবীর যেখানেই বাঙালির বসবাস, সেখানেই নববর্ষ উদযাপিত হয়। ভোরের প্রথম প্রহরে উচ্চারিত হয়—‘এসো হে বৈশাখ, এসো এসো’।

ঐতিহ্যবাহী পোশাক—পাঞ্জাবি, শাড়ি, গামছা, ফতুয়া—এই উৎসবকে দেয় স্বাতন্ত্র্য। নৌকাবাইচ, লাঠিখেলা, কুস্তি, হাডুডু—এসব খেলাধুলায় বাঙালির সংস্কৃতির পরিচয় স্পষ্ট।

কৃষিনির্ভর সমাজে ধাঁধা, প্রবাদ, লোকগান ও পালাগান বাঙালির জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দীনেশচন্দ্র সেন, জসীমউদ্দীনসহ অনেকেই এই লোকসংস্কৃতির ধারাকে লালন করেছেন। ঢাকার রমনার বটমূলে নববর্ষ উদযাপন এখন এক প্রধান সাংস্কৃতিক আয়োজন।

১৯৮৯ সাল থেকে চারুকলার শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রা (বর্তমানে বৈশাখী শোভাযাত্রা) এই উৎসবকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। একসময় গ্রামবাংলায় বৈশাখী মেলা ছিল অন্যতম আকর্ষণ। পুতুলনাচ, সার্কাস, বায়োস্কোপ, পালাগান, কীর্তন, নৌকাবাইচ—সব মিলিয়ে ছিল উৎসবের আমেজ। মেলায় পাওয়া যেত পিঠা, বাতাসা, কদমা, মুড়কি-মোয়া ও নানা কারুপণ্য।

আজও অনেক জায়গায় এই ঐতিহ্য টিকে আছে।

কবিতায় বৈশাখ নানা রূপে ধরা দিয়েছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় ধ্বংসের মধ্য দিয়ে নতুন সৃষ্টির যে ধারণা উঠে এসেছে, তা বৈশাখের রুদ্র রূপের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কবির ভাষায়, ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর? প্রলয় নূতন সৃজন-বেদন!...’

এ ছাড়াও, জাতীয় কবির ‘কালবৈশাখী’ কবিতায় এর ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ রূপ, ফররুখ আহমদের ‘বৈশাখের কালো ঘোড়া’-য় শক্তির প্রতীক, আর জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বৈশাখ প্রকৃতির নির্মলতার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে।

রাষ্ট্রচিন্তক আবুল মনসুর আহমদ বলেন, ‘বহুদর্শনের ফলে শহরবাসীর এই যে মনের বিকাশ ও দৃষ্টির প্রসারতা, এটা তারা লাগাইতে চায় নিজের সমাজের ও দেশের কাজে। অপরের দেখাদেখি নিজের লোককে ভাল করিয়া তুলিবার প্রবল ইচ্ছা জাগে তাদের অন্তরে। তারা হইয়া উঠে রিফর্মিস্ট। তারা নিজেদের চাল-চলনে, আচার-ব্যাবহারে, ঈদে-পার্বণে, এমনকি ধর্ম বিশ্বাসে, এক কথায় নিজেদের কালচারে, সংস্কার প্রবর্তন করিয়া সেটাকে করিতে চায় অধিকতর ভব্য, শালীন সুন্দর। (বাংলাদেশের কালচার)’

নববর্ষে গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে সংস্কৃতির নিবিড় সংযোগ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নতুন পোশাক, বাড়ি পরিষ্কার, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা—সব মিলিয়ে এটি হয়ে ওঠে মিলনমেলা।

নানা জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থানে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতি বাঙালিদের একসূত্রে বেঁধে রাখে। তবে উৎসব আনন্দের পাশাপাশি মানবিক দায়িত্বও ভুলে গেলে চলবে না। গ্রামে এখনো অনেক মানুষ দারিদ্র্যপীড়িত। তাই নববর্ষের এই আনন্দে সচ্ছলদের উচিত অসচ্ছলদের পাশে দাঁড়ানো—এটাই হোক বাঙালির বৈশাখের সত্যিকারের চেতনা।

 


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রাত পোহালেই পহেলা বৈশাখ: বর্ষবরণের প্রাণের উৎসব

পহেলা বৈশাখ যেভাবে বাঙালি সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠল

শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় আশা ভোঁসলেকে শেষ বিদায়

পুলিশ কমিশন গঠনের পরিকল্পনা করছে সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্য বড় সুখবর

কৃষক কার্ড বিতরণ উদ্বোধন করতে টাঙ্গাইলে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

আমরা সবাই ‘জুলাই প্রোডাক্ট’ : জামায়াত আমির

পহেলা বৈশাখ জাতিসত্তা ও সংস্কৃতির অনন্য প্রতীক: প্রধানমন্ত্রী

১২ দিনে রেমিট্যান্স এলো ১৪৪ কোটি ডলার

পহেলা বৈশাখে বন্ধ থাকবে মেট্রোরেলের যেসব স্টেশন 

১০

ভিজিটর ভিসার মেয়াদ নিয়ে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের নতুন বার্তা

১১

হরমুজে সমুদ্রে মাইন আতঙ্ক, কয়েকটিতেই থমকে যেতে পারে বিশ্ব

১২