জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে হট্টগোল ও উত্তেজনার ঘটনায় অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে গেছেন ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘বিদেশিদের সামনে হেনস্তা হলাম, খুব ব্যথিত হয়েছি।’
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের চীন-মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে জুলাই শহিদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের সংবর্ধনা এবং আলোচনা সভায় এ ঘটনা ঘটে।
অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায় নিয়ে নির্মিত একটি ভিডিও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। প্রদর্শনী শেষে জুলাইয়ের আহত ও শহিদ পরিবারের সদস্যদের একাংশ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতাকর্মীরা প্রামাণ্যচিত্রে বিভিন্ন অসংগতির অভিযোগ তুলে হট্টগোল শুরু করেন। এ সময় ‘ভুয়া, ভুয়া’ স্লোগানও দেয়া হয়।
বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তা ও কূটনীতিকরা অনুষ্ঠানস্থল ছেড়ে চলে যান। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যরা মঞ্চের সামনে অবস্থান নেন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। একপর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন বলেন, ‘আপনারা এখানে নিজেকে জাহির করতে আসছেন।’
তার এই মন্তব্যের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সবাইকে শান্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে যাদের আপত্তি রয়েছে, তাদের মঞ্চে এসে বক্তব্য দেয়ার অনুরোধ করেন
এরপর এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন মঞ্চে উঠে বলেন, প্রদর্শিত প্রামাণ্যচিত্রে অনেক অসংগতি রয়েছে। বিশেষ করে ৩ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। বিষয়টি সরকারের নজরে এনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান আখতার। একই সঙ্গে শহিদ পরিবারের প্রতি সম্মান জানিয়ে সবাইকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান বলেন, প্রামাণ্যচিত্রে কোনো অসংগতি থাকলে তা চিহ্নিত করে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। এতে কেউ কষ্ট পেয়ে থাকলে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
‘জাতীয় অনুষ্ঠানে এমন ঘটনা মোটেই কাম্য নয়’:
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সকালে তিনি একটি সুন্দর অনুষ্ঠান দেখেছেন এবং সেখানে মানুষের ঐক্য দেখেছেন। তবে প্রামাণ্যচিত্রে কিছু ভুল ছিল।
তিনি বলেন, ‘আবু সাঈদের ছবিই দেখলাম না। ভুল হতেই পারে। কিন্তু এ জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ক্ষমা চাওয়ার পরও যে ঘটনা ঘটল, তা অনভিপ্রেত। জাতীয় অনুষ্ঠানে এমন ঘটনা মোটেই কাম্য ছিল না।’
বিদেশি অতিথিদের অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিদেশি অতিথিরা অনুষ্ঠান ছেড়ে চলে গেলেন, এটি তো ভালো দেখাল না। আমরা জাতীয় ঐক্য দেখাতে পারলাম না। সংসদ ভবনের মতো এখানে ওয়াকআউট করা একেবারেই শোভনীয় ছিল না।’
বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতির সামনে “ভুয়া ভুয়া” স্লোগান দেয়া কোনোভাবেই মানানসই নয়। আমরা তো জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে এখানে এসেছি, উড়ে এসে জুড়ে বসিনি। ভুল করলে শুধরে দেবেন, কিন্তু বিশৃঙ্খলা করে কোনো লাভ নেই।’
পরে রাজনৈতিক অবস্থানও স্পষ্ট করেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, ‘এই সরকার জনগণের নির্বাচিত সরকার। এই সরকার আওয়ামী লীগ হতে পারবে না, হতেও চায় না। আওয়ামী লীগের কোনো অনুশোচনা নেই। তারা দেশে আসার ঘোষণা দেয়; আসেন, দেখা হবে রাজপথে।’
জুলাই আন্দোলনকারীদের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার জুলাই যোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান দেবে। শহিদদের মর্যাদা রক্ষা এবং আহতদের উন্নত চিকিৎসার সব ব্যবস্থা সরকার নিশ্চিত করবে।
অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের শহিদ পরিবারের সদস্য, আহত জুলাই যোদ্ধা, ছাত্রনেতা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।