ভারতীয় রাজনীতির এক অদ্ভুত চরিত্র সেটি হলো ককরোচ বা আরশোলা, অথবা তেলাপোকা।
একগুঁয়ে, যাকে নিশ্চিহ্ন করা অসম্ভব এবং মানুষের ভীষণ অপছন্দ করে এমন এক কীটকে সামনে রেখেই তৈরি হয়েছে এক ধরনের ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম, যার নাম 'ককরোচ জনতা পার্টি' বা সিজেপি।
এক সপ্তাহেরও কম সময়ে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম লাখ লাখ ফলোয়ার এবং মূলধারার গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রবীণ রাজনীতিবিদদেরও নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করেছে বৈকি।
তবে সিজেপি কোনো আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক দল নয়। বরং এটাকে রাজনৈতিক ব্যঙ্গবিদ্রূপকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এক জাতীয় অনলাইন আন্দোলন হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
এর সদস্যপদের জন্য বেশ কয়েকটা শর্তও রয়েছে যা রসিকতায় মোড়া। যেমন সদস্য হতে গেলে বেকার, অলস, সারাক্ষণ অনলাইনে সক্রিয় থাকাটা আবশ্যক।
ককরোচ জনতা পার্টি-র নেপথ্যে রয়েছেন বোস্টন ইউনিভার্সিটির ছাত্র ও পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটিজিস্ট অভিজিৎ দীপকে।
বিবিসি মারাঠিকে অভিজিৎ দীপকে বলেছেন, "আমি ভেবেছিলাম আমাদের সবার একত্রিত হওয়া উচিত, হয়তো একটা প্ল্যাটফর্ম শুরু করা যেতে পারে।"
তবে এতদিন ভারতের অনেক তরুণই বলতেন যে তারা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্রমাগত রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বিষয়ের সংস্পর্শে আসছেন বটে, কিন্তু রাজনীতি এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে তাদের বিশেষ প্রতিনিধিত্ব নেই। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার বাইরে গিয়ে সিজেপি কোথাও একটা তরুণদের প্রতিনিধিত্বের একটা প্রতীক হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে তরুণদের নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভের ঢেউ দেখা গেছে যা শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং বাংলাদেশে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। এই ক্ষোভের মূলে ছিল চাকরির সমস্যা, মূল্যবৃদ্ধির মতো ইস্যু।
যদিও মি. দীপকে এই বিষয়ে নেপাল বা শ্রীলঙ্কার অভ্যুত্থানের সঙ্গে ভারতের তুলনা করতে চাননি। তিনি বলেছেন, ভারতের পরিস্থিতি অন্যরকম। তার যুক্তিতে ভারতীয় তরুণদের মধ্যে হতাশা রয়েছে, কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম ভিন্ন। মূলত অনলাইনে তারা ক্ষোভ-হতাশা প্রকাশ করেন এবং সেটাও একত্রে নয়, বরং ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
তার কথায়, "জেন-জি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল বিষয়ে হাল ছেড়ে দিয়েছে এবং তারা এমন এক রাজনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি করতে চায়, যার ভাষা নিজেরা বুঝতে পারে।"
সিজেপি-র ওয়েবসাইট কিন্তু সেই চিন্তাধারাকেই প্রতিফলিত করে। সিজেপি-র ওয়েবসাইট পড়লে ইশতেহার বলে মনে হয় না, বরং ইন্টারনেটে যে ধরনের কথাবার্তা পড়তে আমরা অভ্যস্ত তারই প্রতিফলন নজরে আসে।
সিজেপি নিজেকে "অলস এবং বেকারদের কণ্ঠস্বর" হিসেবে বর্ণনা করে। পাশাপাশি একে "জিরো স্পনসর", অর্থাৎ এর নেপথ্যে কোনো স্পনসর নেই বলে দাবি করে।
ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বিতর্কিত মন্তব্যের পর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে আরশোলা।
এক মামলার শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ এক আইনজীবীর আচরণে অসন্তুষ্ট হন।
ওই আইনজীবী অভিযোগ করেছিলেন যে দিল্লি হাইকোর্ট জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের তালিকাভুক্তি সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশিকা বাস্তবায়ন করতে বিলম্ব করছে। তার দাবি ছিল, এর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার সংক্রান্ত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
সেই আবেদন খারিজ করে দিয়ে আদালতের ওই বেঞ্চ জানায়, 'সিনিয়র অ্যাডভোকেট'-এর পদমর্যাদা আদালতের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়, এটা কোনো মর্যাদার প্রতীক নয়।
বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চ বলে, "সমাজে ইতোমধ্যেই পরজীবী রয়েছে যারা ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ করে। আপনিও কি তাদের দলে যোগ দিতে চান? এমন কিছু যুবক আছে যারা কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিজেদের পেশায় জায়গা করে নিতে না পারার কারণে তেলাপোকার মতো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।"
"তাদের মধ্যে কেউ গণমাধ্যমে কাজ শুরু করে, কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় হয়, কেউ আরটিআই (রাইট টু ইনফর্মেশন) কর্মী হয়, কেউ অন্য ধরনের অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে ওঠে এবং তারপর সবাইকে আক্রমণ করতে শুরু করে।"
পরে অবশ্য প্রধান বিচারপতি বিষয়টা স্পষ্ট করে দেন যে, তিনি মূলত 'ভুয়া ও জাল ডিগ্রিধারী' ব্যক্তিদের কথা বলছিলেন, বৃহত্তর অর্থে ভারতের যুবসমাজকে উদ্দেশ্য করে কিছু বলেননি। তার মন্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
কিন্তু ততক্ষণে মন্তব্যগুলো অনলাইনে বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়েছে এবং একে কেন্দ্র করে একদিকে যেমন ক্ষোভ ও কৌতুক শুরু হয় তেমনই এর হাত ধরে জন্ম নেয় 'ককরোচ জনতা পার্টি' নামক এক মজাদার রাজনৈতিক চিন্তার।
নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির যন্তর মন্তরের আন্দোলন থেকে দেশটির শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের মূল দাবি পূরণ হওয়ার পর প্রতিবাদ কর্মসূচি স্থগিত করেছিল ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপির)।
আন্দোলনকারীরা সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রা শুরু করায় সেই সময় দিল্লি পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ করে। ওই সময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু শিক্ষার্থী আহত হন এবং আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্যও আহত হয়েছিলেন।
সিজেপি নেতারা বলেছেন, সরকারের সঙ্গে আলোচনায় তাঁরা আন্দোলন প্রত্যাহারের জন্য তিনটি দাবি রেখেছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা, আন্দোলনকারী যেসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজ্যের পুলিশ এফআইআর দায়ের করেছে, তা নিঃশর্তভাবে প্রত্যাহার এবং আত্মঘাতী নিট পরীক্ষার্থীদের প্রতি পরিবারকে এক কোটি রুপি অর্থসাহায্য।
সরকার তিনটি দাবিই মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দাবি করে সিজেপি নেতারা বলেছেন, গত ২৫ জুলাই ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করেছেন। প্রতিশ্রুতির নিরিখে সিজেপিও যন্তর মন্তর থেকে আন্দোলন প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সরকারের দুই শীর্ষ মন্ত্রীকে তাঁরা বিশ্বাস করেছিলেন। ভেবেছিলেন, সরকার প্রতিশ্রুতি রাখবে। কিন্তু তারপরেও সরকার বাকি দুটি দাবি মানেনি। তাই বাধ্য হয়ে তাঁরা পথে নামার কর্মসূচি নিয়েছেন।
আগামী ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষক দিবসের দিন সিজেপি নেতৃত্ব দিল্লির ইন্ডিয়া গেটে সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সেখান থেকে শান্তিপূর্ণ মিছিল করে তারা যাবে দিল্লি পুলিশের সদরদপ্তরে সিজেপির ন্যাশনাল ওয়ার্কিং কমিটি গতকাল সোমবার এই কর্মসূচির কথা জানিয়েছে।
সিজেপির তিন শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দিপকে, আশুতোষ রাংকা ও সৌরভ দাস জানিয়েছেন, তাঁদের সমাবেশ হবে পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ। এই প্রতিবাদ মিছিলের নেতৃত্বে থাকবেন আত্মঘাতী নিট পরীক্ষার্থীদের পরিবার ও সংসদ অভিযানের সময় পুলিশি অত্যাচারের শিকার ব্যক্তিরা।