চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে স্থানীয় সরকার খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে সরকার। গতকাল সোমবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় সংশোধিত এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়।
সংশোধিত এডিপিতে মোট বরাদ্দ ১২ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে ২ লাখ ৮ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ মূল প্রস্তাবিত ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা থেকে প্রায় ৭৪ শতাংশ কমানো হয়েছে। একইভাবে শিক্ষা খাতের বরাদ্দ ২৮ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা থেকে কমেছে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার খাতে বরাদ্দ ১২ শতাংশ বাড়িয়ে ১৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকা করা হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন কমিউনিটি সহায়তা কার্যক্রমসহ স্থানীয় সরকার বিভাগই সংশোধিত এডিপিতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে—৩৭ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা।
সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচন এবং দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত সড়ক ও সেতু সংস্কারের প্রয়োজন বিবেচনায় স্থানীয় সরকার খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তিনি জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রকল্প পরিচালকদের অনুপস্থিতি, নতুন সরকারি ক্রয়পদ্ধতি বাস্তবায়নের জটিলতা, উচ্চ সুদের হার ও কম বৈদেশিক বিনিয়োগের কারণে এডিপি বাস্তবায়নের গতি কমেছে। দুর্নীতির অভিযোগে অপসারণ বা অনুপস্থিতির কারণে একাধিক প্রকল্পে নতুন প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দিতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, বর্তমানে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম শতভাগ ই-জিপি (ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রোকিউরমেন্ট) পদ্ধতিতে পরিচালিত হচ্ছে। শুরুতে কিছুটা সময় লাগলেও এতে প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এখন গড়ে প্রতি দরপত্রে সাত থেকে আটটি দর পাওয়া যায়, যেখানে আগে দুই বা তিনটির বেশি দর আসত না।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্প পরিচালকদের নিয়মিত অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা এবং চলমান প্রকল্পের স্বাধীন মূল্যায়নের কারণে বাস্তবায়নের মানও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। তবে গুণগত মান বাড়াতে গিয়ে যদি উন্নয়ন ব্যয়ের সামগ্রিক আকার সংকুচিত হয়, তাহলে তা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এডিপির আকার কমার পেছনে মূল্যস্ফীতিকেও একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন পরিকল্পনা উপদেষ্টা। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত সুদের হার বেশি রাখায় সুদের হার বেড়েছে এবং বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর ও মেট্রোরেল প্রকল্পের বিষয়ে তিনি বলেন, কিছু বড় প্রকল্প ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যাতে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারে। নতুন কয়েকটি মেট্রোরেল লাইনে দাতা সংস্থার আগ্রহ থাকলেও সব লাইন একসঙ্গে শুরু করলে ঢাকায় বড় ধরনের ভোগান্তি তৈরি হতে পারে বলে সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতের জন্য রাখা হয়েছে।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ছোট এডিপি মানেই অর্থনৈতিক মন্দা নয়। বিনিয়োগ বাড়লে কর্মসংস্থানও বাড়ত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি ইতিবাচক দিক হলো প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমার বিষয়টি স্বীকার করে ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, ভবিষ্যতে এসব খাতে বরাদ্দ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তিনি জানান, নব্বইয়ের দশক থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত মূলত বৈদেশিক ঋণ ও অনুদাননির্ভর কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল ছিল। সময়ের সঙ্গে সেই সহায়তা কমে গেলেও দেশীয় অর্থায়নে রূপান্তরের প্রস্তুতি যথাযথ ছিল না।
এর ফলে অনেক স্বাস্থ্য প্রকল্পের অর্থায়ন শেষ হয়ে গেলেও কার্যক্রম চলমান ছিল, যা পরে বড় ধরনের অর্থসংকট তৈরি করে। পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, অতিরিক্ত বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ধীরে ধীরে স্বনির্ভরতার পথে এগোনো এখন অপরিহার্য।