গত ২৪ ঘণ্টায় সমুদ্র ও স্থলপথে প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসী স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ভূখণ্ড সেউতায় ঢুকে পড়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। মরক্কোর সঙ্গে সীমান্তবর্তী ছোট্ট এই ভূখণ্ডে আইনের বিভিন্ন ফাঁকফোকর কাজে লাগিয়ে স্থায়ী বসবাসের উদ্দেশ্যে বিপুলসংখ্যক অভিবাসী প্রবেশের চেষ্টা করছেন। এতে সীমান্তের নিরাপত্তা-ব্যবস্থা কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং ওই অঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
শুক্রবার (৩১ জুলাই) টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, তাদের হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৪৯ হাজার অভিবাসী সেউতায় ঢুকেছেন। অথচ অঞ্চলটির মোট জনসংখ্যা প্রায় ৮৪ হাজার। প্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, বিপুলসংখ্যক মানুষ সাঁতরে উপকূলে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। উপকূলে পৌঁছানোর পর তাদের অনেকেই ভিড়ের মধ্যে উঠে আসছেন। অন্যদিকে দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে আরও অনেকে স্থলসীমান্ত দিয়ে দ্রুত সেউতায় ঢুকে পড়েছেন অনেকে। অনুপ্রবেশের চেষ্টার সময় অন্তত ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।
এই বিপুল অভিবাসী প্রবেশ ইউরোপে নতুন করে অভিবাসন সংকটের আশঙ্কা তৈরি করেছে। স্পেনের সমাজতান্ত্রিক প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের সরকারের অধীনে তাদের সাধারণ ক্ষমা দেয়া হলে তারা ইউরোপের শেনজেন এলাকায় প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন- এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই পরিস্থিতিকে ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য ‘হুমকি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপের ২৯ সদস্যের পাসপোর্টমুক্ত শেনজেন অঞ্চল থেকে স্পেনকে বাদ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
মেলোনি বলেন, ‘সেউতা থেকে আসা ছবিগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এগুলো আবারও প্রমাণ করে যে নিয়ন্ত্রণহীন অবৈধ অভিবাসন ইউরোপের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য বাস্তব হুমকি। ইতালি হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। সীমান্ত ও নাগরিকদের নিরাপত্তা রক্ষায় আমরা পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। এর মধ্যে স্পেনের সঙ্গে শেনজেন অঞ্চল স্থগিত করার বিষয়টিও রয়েছে।’
সমুদ্রপথে প্রবেশে আদালতের রায়ের সুযোগ
সেউতার স্থলসীমান্তে প্রায় ১০ মিটার উঁচু নিরাপত্তাবেষ্টনী রয়েছে এবং সেখানে কঠোর পুলিশি নজরদারি চালানো হয়। তবে সমুদ্রপথে প্রবেশের ক্ষেত্রে অভিবাসীরা সাম্প্রতিক একটি আদালতের রায়ের সুবিধা পাচ্ছেন।
গত মাসে স্পেনের সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয় যে, সেউতা এবং কাছের মেলিলায় সমুদ্রপথে পৌঁছানোর চেষ্টা করার সময় আটক করা অভিবাসীদের তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত পাঠানো যাবে না। আদালত জানিয়েছে, দ্রুত সীমান্তে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা (যাকে ‘হট রিটার্ন’ বলা হয়) শুধু স্থলসীমান্ত দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যাবে।
সেউতা ও মেলিলা ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও শেনজেন এলাকার এমন দুটি অঞ্চল, যেগুলোর সঙ্গেই শুধু আফ্রিকার সরাসরি স্থলসীমান্ত রয়েছে। শেনজেন চুক্তির আওতায় ইউরোপের ২৯টি দেশের মধ্যে মানুষ অবাধে চলাচল করতে পারেন।
স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস বলেন, ‘এ ধরনের বার্তা কোনো অংশীদার ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। আমরা ইউরোপীয় সংহতি আশা করি, দলীয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা বক্তব্য নয়।’
শেনজেন থেকে স্পেনকে বাদ দেয়ার দাবি
ইতালির প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানিও স্পেনের সমাজতান্ত্রিক সরকারের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি স্পেনের জন্য শেনজেন অঞ্চল বন্ধ করার পক্ষে। অনিয়মিত এবং অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বিপদ ডেকে আনে।’
দুই দেশের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিবাদে তাজানির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিয়েছেন স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেজ। তিনি বলেন, ‘এই বার্তাটি একটি অংশীদার ও বন্ধুত্বপূর্ণ দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর জন্য শোভনীয় নয়, যে দেশের কাছ থেকে আমরা ইউরোপীয় সংহতি আশা করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকের ঘটনাগুলোর সঙ্গে একটি আদালতের রায়ের সম্পর্ক রয়েছে। ওই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া বার্তায় যে বিষয়টির কথা বলা হয়েছে, তার সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। আমি আগামীকাল ইতালির রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছি।’
ইউরোপজুড়ে বিতর্ক
অভিবাসীদের বৈধতা দেয়ার বিষয়ে মাদ্রিদের নীতি দেশের অভ্যন্তরে এবং ইউরোপজুড়েই বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। গত মাসে ইউরোপীয় নেতাদের এক বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়ে মেলোনি ও সানচেজের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা যায়। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক গোষ্ঠী মধ্য-ডানপন্থি ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টির সভাপতি মানফ্রেড ওয়েবার বলেন, ‘অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর নিয়ম কার্যকর করা প্রয়োজন।’
ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি দলের সভাপতি জর্ডান বারদেলা অভিযোগ করেন, স্পেনের নাগরিকত্ব দেয়ার নীতি ‘সব ধরনের বিপদের’ জন্য ইউরোপের দরজা খুলে দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে হাজার হাজার অভিবাসী সেউতা ভূখণ্ডে ঢুকে পড়ছে। আগামীকাল তারা ফরাসি জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমে আসবে।’