এক সময় খালটিতে ইচি (চিংড়ি) মাছের এতই প্রাচুর্য ছিল যে স্থানীয়রা নাম দিয়েছিলেন ‘ইচিমারির খাল’। কিন্তু বছরের পর বছর পলি জমে বড়াল ও মুসা খাঁ নদীর সংযোগকারী এই খালটি ভরাট হয়ে গেলে পানিপ্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। লোকমুখে পরিচিতি পায় ‘মরা খাল’ নামে। সেচের পানির অভাবে শত শত একর কৃষিজমিতে উৎপাদন কমে যায়, বর্ষায় জলাবদ্ধতায় দুর্ভোগ পোহাতে হতো হাজারো মানুষকে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি ১০ দশমিক ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ ইচিমারির খাল পুনর্খননের কাজ শেষ হয়েছে। ফলে আবারও বড়াল ও মুসা খাঁ নদীর মধ্যে পানিপ্রবাহের দুয়ার উন্মুক্ত হয়েছে। দূর হচ্ছে সেচসংকট ও জলাবদ্ধতা। নতুন করে আশার আলো দেখছেন কয়েক হাজার প্রান্তিক কৃষক। ইতোমধ্যে কৃষকেরা খালের পানিতেই পাট জাগ দেওয়া শুরু করেছেন।
এই প্রকল্পের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো সরকারি অর্থের সাশ্রয়। কাজের গুণগত মান নিশ্চিত করে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের পর বরাদ্দের অব্যবহৃত ২৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি’র আওতায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চারঘাট উপজেলার একমাত্র এই খাল পুনর্খননের জন্য প্রায় ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। উপজেলার ঝাউবোনা থেকে বড়াল নদ হয়ে নিমপাড়ার মুসা খাঁ নদী পর্যন্ত খালটি পুনর্খনন করা হয়েছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়। খাল পুনর্খননের পাশাপাশি দুই পাড় সংরক্ষণ, পাড়ঘেঁষা রাস্তা সংস্কার এবং দুই পাশে দুই হাজার গাছ রোপণ করা হয়েছে। প্রকল্পে যাচাই-বাছাই করে স্থানীয় ৬৫৪ জন অতিদরিদ্র মানুষকে কাজের সুযোগ দেওয়া হয়। ফলে অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি কর্মহীন মৌসুমে দরিদ্র মানুষের আয়ও নিশ্চিত হয়েছে।
গত রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, খালের বিভিন্ন অংশে এখন নিয়মিত পানি প্রবাহিত হচ্ছে। কৃষকেরা খালের পানিতে পাট জাগ দিচ্ছেন, কেউ কেউ সেচের জন্য পানি ব্যবহার শুরু করেছেন।
ভাটপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, ভাগ্যিস খালটা খনন হয়েছে। না হলে এত পাট কোথায় জাগ দিতাম? গত বছর ১৩ কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে পাট জাগ দিতে হয়েছে। এবার বাড়ির পাশের খালেই পাট জাগ দিচ্ছি।’ আরেক কৃষক হানিফ আলী বলেন, ‘বর্ষা এলেই জলাবদ্ধতায় ফসল নষ্ট হতো। এখন সেই সমস্যা অনেকটাই কমবে। বড়াল ও মুসা খাঁ নদীর পানি বাড়লে আরও বেশি পানি চলাচল শুরু হবে, দেশীয় মাছও বাড়বে।’
স্থানীয় শ্রমিক মসলেম উদ্দিন বলেন, ‘প্রায় এক মাস এই প্রকল্পে কাজ করেছি। প্রতিদিনের আয় দিয়ে সংসার চালাতে পেরেছি। এই কাজ না থাকলে অনেকেই বেকার থাকতেন।’
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা ফরহাদ লতিফ বলেন, ‘খাল পুনর্খননের মাধ্যমে একদিকে কৃষকদের দীর্ঘদিনের সেচ ও জলাবদ্ধতার সমস্যা সমাধান হয়েছে, অন্যদিকে অতিদরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের নীতিমালা মেনেই কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, ‘সরকারি অর্থ জনগণের আমানত। প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটি টাকাও ব্যয়ের সুযোগ নেই। সঠিক পরিকল্পনা, স্বচ্ছতা ও নিয়মিত তদারকি থাকলে নির্ধারিত বাজেটের মধ্যেই মানসম্মত কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব। আমরা সেই নীতিতেই কাজ করেছি। কাজ শেষে যে অর্থ প্রয়োজন হয়নি, তা সরকারি কোষাগারেই ফেরত দেওয়া হয়েছে।’