জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হামলাসহ ক্যাম্পাসে সংঘটিত নানা ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৩ শিক্ষক-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট। এর মধ্যে এক শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসর ও ১২ শিক্ষক-কর্মকর্তাকে ভিন্ন ভিন্ন শাস্তি দেওয়া হয়েছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওয়ামী লীগপন্থি শিক্ষকদের সংগঠন বঙ্গবন্ধু শিক্ষক পরিষদের সদস্য ছিলেন৷
রাতভর বৈঠক শেষে গতকাল মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে সাংবাদিক ও শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত তুলে ধরেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ কামরুল আহসান। তিনি জানান, ১৯ শিক্ষক ও দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এক শিক্ষককে বাধ্যতামূলক অবসর, ৯ শিক্ষক ও এক কর্মকর্তার পদাবনতি-বেতন অবনমন করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই শিক্ষককে সতর্ক করা হয়। সাত শিক্ষক ও এক কর্মকর্তা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন।
এদিকে প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদনে নাম আসায় তৎকালীন উপাচার্য মো. নুরুল আলম, সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) মনজুরুল হক ও কোষাধ্যক্ষ রাশেদ আখতারের বিরুদ্ধে তিনটি স্ট্রাকচারাল কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সিন্ডিকেট।
২০২৪ সালের ১৪, ১৫ ও ১৭ জুলাই সংঘটিত ঘটনা ঘিরে গঠিত তদন্ত ও স্ট্রাকচারাল কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সিন্ডিকেট এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যারা শাস্তি পেলেন
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মেহেদী ইকবালকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি হামলার অভিযোগ ছিল। নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ইস্রাফিল আহমেদের বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রভাষক পদে পদাবনতি করা হয়েছে একই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মহিবুর রৌফ শৈবালকে। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক নাজমুল হোসেন তালুকদারের দুই বছরের ইনক্রিমেন্ট বাতিল করে নিম্নতর বেতনস্তর নির্ধারণ করা হয়েছে। দুই বছরের ইনক্রিমেন্ট বাতিল করা হয়েছে অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের প্রভাষক কানন কুমার সেনের। সাবেক প্রক্টর ও পরিসংখ্যান ও উপাত্ত বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আলমগীর কবিরের বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
এ ছাড়া সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদের বেতন বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দুই বছর পর গ্রেড উন্নয়নের আবেদন করার সুযোগ রাখার পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এ এ মামুনকে সতর্ক করার পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য এবং ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরাকে সতর্ক করা হয়েছে।
উপাচার্য জানান, পাবলিক হেলথ অ্যান্ড ইনফরমেটিকস বিভাগের অধ্যাপক তাজউদ্দীন শিকদারের বেতন প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দিয়ে দুই বছর পর গ্রেড উন্নয়নের আবেদন করার সুযোগ রাখার পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। বর্তমান পদের প্রারম্ভিক স্কেলে নামিয়ে দেওয়া হয়েছে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আ স ম ফিরোজ-উল-হাসানের বেতন, পাশাপাশি দুই বছর পর পদোন্নতির আবেদন করার সুযোগ এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। সাবেক সহ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজের বেতন দ্বিতীয় গ্রেডে নামিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে দুই কর্মকর্তার মধ্যে ডেপুটি রেজিস্ট্রার নাহিদুর রহমান খানকে সহকারী রেজিস্ট্রার পদে পদাবনতি দেওয়ার পাশাপাশি দুই বছর পর ফের পদোন্নতির আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
ছাত্র সংগঠনগুলো বলছে প্রহসনের বিচার
জাকসুর জিএস ও জাবি ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারি মাজহারুল ইসলাম বলেন, জুলাই হামলায় অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিচারের নামে প্রহসন করেছে প্রশাসন। তারা সাপও মারলেন না, লাঠিও ভাঙলেন না।
জাবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি অদ্রি অঙ্কুর বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের মধ্যে শুধু প্রো-ভিসির (শিক্ষা) বিষয়ে সিদ্ধান্ত এসেছে। ভিসি, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) ও ট্রেজারারের ক্ষেত্রে নতুন করে স্ট্রাকচার কমিটি গঠন ছাড়া আর কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, তৎকালীন প্রক্টর আলমগীর কবিরকে যে মৃদু শাস্তি দেওয়া হয়েছে সেক্ষেত্রে শুধু বেতন গ্রেড কমানো এবং পাঁচ বছরের জন্য প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত নিয়ে জুলাইয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশক্তির সভাপতি জিয়াউদ্দিন আয়ান বলেন, শিক্ষকরা আসলে শিক্ষকের বিচার করতে চান না। গণঅভ্যুত্থানের এতদিন পর জুলাই হামলায় অভিযুক্ত শিক্ষকের বিচার প্রশ্নে প্রশাসন আবারও সেটিই প্রমাণ করল।
জাবি ছাত্রদলের সদস্য সচিব ওয়াসিম আহমেদ অনিক বলেন, শাস্তির বিষয়টি আরও পর্যালোচনা করে পরে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাব।