কাপ্তাইয়ের সুউচ্চ সীতা পাহাড়ের চূড়া। কুয়াশা ভেদ করে সোনালি রোদে চিকচিক করছে পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে পেকে থাকা জুমের ধান। সবুজের বুকে যেন কেউ এঁকে দিয়েছে সোনালি আলপনা। সমতল থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট উঁচু দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে কাপ্তাইয়ের সীতা পাহাড়ে উঠলেই চোখে পড়ে এমন রূপালি-সোনালি ক্যানভাস।
পাহাড়ে এখন চলছে জুমের ফসল ঘরে তোলার ধুম। পাহাড়ের ঢালে ঢালে ব্যস্ত সময় পার করছেন জুমিয়ারা। তবে আনন্দের এই সোনালি হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে দীর্ঘশ্বাস। আগের মতো ফলন না হওয়ায় কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে তাদের।
শুধু ধান নয়, জুমের এই বৈচিত্র্যময় ক্ষেতে একসঙ্গে চাষ করা হয়েছে স্থানীয় জাতের মারফা, মিষ্টি কুমড়া, কলা, হলুদ, তিল ও ভুট্টা। ফসলের ক্ষেতের পাশে তৈরি করা ছোট ছোট জুমঘরগুলো যেন পাহাড়ি জীবনের একেকটি ছোট সংসার। নিজের ঘাম ও শ্রমে গড়ে তোলা এসব ফসল ঘরে তোলার আনন্দও আলাদা। তবে এই ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের পেছনে রয়েছে মাসের পর মাসের হাড়ভাঙা পরিশ্রম।
প্রথম ধাপে পৌষ-মাঘ মাসে পাহাড়ের ঢালের ঝোপঝাড় কাটা হয়। দ্বিতীয় ধাপে ফাল্গুন-চৈত্র মাসে কাটা ঝোপঝাড় আগুনে পুড়িয়ে পাহাড়ের জমিকে জুম চাষের উপযোগী করা হয়। এরপর বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে পোড়া জুমের মাটিতে একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের বীজ বপন করা হয়।
তবে এবার চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। কাপ্তাইয়ের সীতা পাহাড়ে জুম চাষ করা সানু মারমা আক্ষেপ করে বলেন, ‘আগে আমরা এক হাঁড়িতে ৫০ থেকে ৬০ আঁটি ধান পেতাম। কিন্তু এ বছর এক হাঁড়িতে ধান পেয়েছি মাত্র ২৫ আঁটি বা তারও কম। আগের তুলনায় ফলন অর্ধেক বা তারও কমে গেছে। আগামী বছর চাষ করতে পারব কি না, তা নিয়েই ভীষণ চিন্তায় আছি।’
আরেক নারী জুমিয়া কৃষক মং সুপ্রু মারমা বলেন, ‘ধানের পাশাপাশি মারফা, হলুদ ও ভুট্টার ফলনও এ বছর ভালো হয়নি। এ কারণেই আমরা চিন্তায় আছি। আগামী বছর কীভাবে চলব, সেটাই এখন বড় চিন্তার বিষয়।’
জুমিয়াদের এমন আশঙ্কার কথা স্বীকার করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রাঙামাটির উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমানে পাহাড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়তি খাদ্যের চাহিদা তৈরি হয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট বিরতি বা গ্যাপ না দিয়ে একই জমিতে ঘন ঘন জুম চাষ করা হচ্ছে। এতে পাহাড়ি জমিতে পর্যাপ্ত জৈব পদার্থ বা জৈব উপাদান আগের মতো থাকছে না। যে কারণে প্রতিবছর জুমের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। কৃষকদের আমরা পরামর্শ দিচ্ছি, দীর্ঘ বিরতি দিয়ে জুম চাষ করার জন্য।’
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর রাঙামাটিতে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে জুম চাষ করা হয়েছে। এসব জমি থেকে ১২ হাজার টন ধান এবং ২৫ হাজার টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে জুমের উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়ার পাশাপাশি জুম চাষের প্রচলিত ধারায় পরিবর্তন আনার তাগিদ দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, পাহাড়ি জমির উর্বরতা ধরে রাখতে নির্দিষ্ট সময় পরপর জমিকে বিশ্রাম দেয়ার পাশাপাশি আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের সমন্বয় জরুরি।