শিক্ষাব্যবস্থা: অনুকরণের শ্রেণিকক্ষে শিশুদের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন

বাংলাদেশে শিক্ষা আজ এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে থেকে দেখলে এটি আশাব্যঞ্জক মনে হয়। ভর্তি হার বেড়েছে, বছরের শুরুতেই বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করা হয়, পরীক্ষার ফলাফল ঊর্ধ্বমুখী, ডিজিটাল ক্লাসরুমের গল্প শোনা যায়। নানা সূচকে উন্নতির এই চিত্র আমাদের আত্মতৃপ্তির কারণ হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতার গভীরে প্রবেশ করলে বোঝা যায়, এই শিক্ষাব্যবস্থা আসলে এক বিশাল অনুকরণশালা- যেখানে বেশিরভাগ শিশুই স্বপ্ন বিনির্মাণ করে না, বরং কেবল টিকে থাকার কৌশল রপ্ত করে।

এই উপলব্ধি কেবল পরিসংখ্যাননির্ভর নয়; এটি মাঠপর্যায়ে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া। শিক্ষা ও নিরাপত্তা বিষয়ক বিদেশি সহায়তায় পরিচালিত দুটি প্রকল্পে চার বছর কাজ করার সুযোগ হয়েছিল- একটি নওগাঁ জেলায়, অন্যটি ঢাকার ধামরাই ও মানিকগঞ্জে। এই প্রকল্পগুলোর কাজের সুবাদে আরবান, সেমি-আরবান এবং গ্রামীণ- তিন ধরনের প্রেক্ষাপটে প্রি-স্কুল থেকে কলেজ পর্যন্ত শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি, কাজ করেছি। শ্রেণিকক্ষ, সহশিক্ষা কার্যক্রম, প্রতিযোগিতা, সচেতনতামূলক সেশন- সব মিলিয়ে শিক্ষার বহুমাত্রিক এক জটিল কর্মযজ্ঞের অভিজ্ঞতা হয়েছে। স্টেকহোল্ডারদের কাছাকাছি থেকে যোগাযোগের প্রায়োগিক ধারণা আরও স্পষ্ট ও খোলাসা হয়েছে।

সেই অভিজ্ঞতায় দেখেছি, শ্রেণিকক্ষের ভেতরে একটি অদৃশ্য বিভাজন খুবই প্রকট। কর্মএলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ২৫- ৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাসিক ও ত্রৈমাসিক বইপড়া প্রতিযোগিতা, চিত্রাঙ্কন, পাঠ্যসূচিভিত্তিক কুইজ, রচনা প্রতিযোগিতা এবং ডিজিটাল লিটারেসি কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারীদের পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি- গড়ে প্রায় ১০% শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থেই মেধাবী ও পরিশ্রমী; আর ১০% পরিশ্রমী হলেও সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে সীমাবদ্ধ। বাকিরা মূলত স্রোতের সঙ্গে ভেসে চলা- স্কুল ও কোচিংনির্ভর, কিন্তু লক্ষ্যহীন। এই বাস্তবতা সবচেয়ে তীব্রভাবে চোখে পড়েছে একটি সহজ প্রশ্নে। স্কুল-কলেজে যখনই শিক্ষার্থীদের জিজ্ঞেস করেছি, ‘তোমার স্বপ্ন কী?’ দুই-তিনজন স্বপ্নের কথা বলতে পেরেছে ঠিকই, তবে কেন সে হতে চায় তা গুছিয়ে বলতে পারেনি। বাকিদের বেশিরভাগের কাছ থেকে পাওয়া গেছে এক বিস্ময়কর উত্তর- ‘সবার সঙ্গে পড়তে আসি।’ এই বাক্যটি নিছক সরলতা নয়; এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটের ভাষা। এখানে শিক্ষা ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বা আত্ম-অনুসন্ধানের পথ নয়, বরং একটি সামাজিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

গত এক দশকের বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে এই বাস্তবতার প্রতিফলন স্পষ্ট। বিশ্বব্যাংকের ২০২২ সালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রাথমিক স্তরের প্রায় ৫৮% শিক্ষার্থী বয়স অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পাঠ্যদক্ষতা অর্জন করতে পারে না- যাকে বলা হয় ‘লার্নিং পোভার্টি’। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে পৌঁছানোর আগেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষার্থী শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে, যদিও তারা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকে। অর্থাৎ, উপস্থিতি আছে, কিন্তু অংশগ্রহণ নেই; বই আছে, কিন্তু বোধ নেই। এই অভিজ্ঞতা ও গবেষণা একই জায়গায় এসে মিলিত হয়- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে বিকশিত করে না, বরং তাকে গড়ে তোলে একটি অনুকরণকারী সত্তা হিসেবে। এখানে শিক্ষা কোনো অনুসন্ধান নয়, কোনো জিজ্ঞাসা নয়; এটি একটি নির্ধারিত পথে হাঁটার বাধ্যবাধকতা। প্রশ্ন করার চেয়ে উত্তর মুখস্থ করাই এখানে সাফল্যের চাবিকাঠি।

বর্তমান বাস্তবতায় মনে হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বেশিরভাগ মানুষ তৈরি করে না, পরীক্ষার্থী তৈরি করে। তৈরি করে এক অনিশ্চিত, লক্ষ্যহীন প্রজন্ম। তারা জানে না তারা কী হতে চায়; কেবল জানে- কিছু একটা হতে হবে। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষালয়গুলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র না হয়ে প্রতিযোগিতার ময়দানে পরিণত হয়েছে। কোচিং সেন্টারগুলো একটি ছায়া-শিক্ষাব্যবস্থা হিসেবে মূল ধারাকে গ্রাস করছে। শিক্ষা হয়ে উঠছে একটি পণ্য, আর শিক্ষার্থী হয়ে উঠছে গ্রাহক। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) তথ্য অনুযায়ী, শহর ও গ্রাম উভয় ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ কোচিংনির্ভর। এর ফলে বিদ্যালয়ের প্রতি আস্থা কমছে এবং শিক্ষকের ভূমিকাও সংকুচিত হচ্ছে। শিক্ষক আর জ্ঞানদাতা নন; তিনি যেন পরীক্ষার প্রস্তুতকারক।

মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে আরও একটি গভীর সমস্যা চোখে পড়েছে- আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মুখস্থবিদ্যার ওপর নির্ভরশীল। সমালোচনামূলক চিন্তা, সৃজনশীলতা বা বাস্তব জীবনের দক্ষতার চর্চা অত্যন্ত সীমিত। ফলে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সুনাগরিক নির্মাণ হচ্ছে না। প্রশ্নের ধরন সামান্য পরিবর্তন করলেই অনেক শিক্ষার্থী আর এগোতে পারে না- কারণ তারা বুঝে শেখেনি, মুখস্থ করেছে। এই বাস্তবতার সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার পরও একধরনের অপূর্ণতা থেকেই যায়। নানা আয়োজন, সেশন, প্রতিযোগিতা- সবকিছু আয়োজনের পরও মনে হয়েছে, শিক্ষার গভীরে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটছে না। প্রকাশ্যে এই কথা বলা বা না বলার মধ্যে হয়তো বড় কোনো পার্থক্য নেই, কিন্তু ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি থেকে যায়- এই ব্যবস্থাকে নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়া যায় না।

এর সমাধান সহজ নয়, কিন্তু জরুরি। প্রথমত, শিক্ষার উদ্দেশ্য পুনর্নির্ধারণ করতে হবে- চাকরির প্রস্তুতি হিসেবে নয়, মানুষ গড়ার প্রক্রিয়া হিসেবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মর্যাদা ও স্বাধীনতা বাড়াতে হবে, যাতে তারা কেবল পাঠদান নয়, চিন্তার দিশা দিতে পারেন। তৃতীয়ত, মূল্যায়ন পদ্ধতিকে পরিবর্তন করতে হবে- নম্বরনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে বোঝাপড়া, দক্ষতা ও প্রয়োগক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে। 

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ‘অনুকরণ’ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অন্য দেশের মডেল অন্ধভাবে অনুসরণ করে নয়, বরং নিজেদের বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনাকে বুঝে একটি মানবিক, প্রাসঙ্গিক ও কার্যকর শিক্ষাব্যবস্থা নির্মাণ করতে হবে। নইলে আমরা হয়তো আরও অনেক শিক্ষিত মানুষ পাব, কিন্তু খুব কম মানুষ পাব- যারা চিন্তা করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে, এবং নিজের মতো করে স্বপ্ন দেখতে পারে। শিক্ষার এই অদৃশ্য শূন্যতা পূরণ না হলে, উন্নয়নের সব পরিসংখ্যানই একদিন অর্থহীন হয়ে যাবে।

● সত্য সরকার, গণমাধ্যম ও উন্নয়নকর্মী


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

উত্তর জাপানে ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি

মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা ব্যক্তিগত সফরে সরকারি সুবিধা নিলে দিতে হবে খরচ

বগুড়া সিটি করপোরেশন, উদ্বোধন করলেন তারেক রহমান

সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির ৩৬ আসনে মনোনয়ন পেলেন যারা

জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়াচ্ছে বিপিসি

বাংলাদেশ পুলিশে বিশাল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদন শুরু ২৮ এপ্রিল

হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু, লক্ষ্য ১ কোটি ৮০ লাখ শিশু

সুইমিংপুলে অচেতন অবস্থায় অভিনেত্রীকে উদ্ধার, হাসপাতালে মৃত্যু

সংসদের ক্রয়কার্য নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত

বগুড়ায় পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

১০

কর্ণফুলীতে যৌথ অভিযানে ৩১২ কোটি টাকার অবৈধ জাল জব্দ

১১

ইসরায়েলের সঙ্গে ইইউ সহযোগিতা চুক্তি বাতিলের দাবি স্পেনের

১২