মেহেরপুরে সরকারি প্রণোদনার আওতায় বিতরণ করা ধান বীজে ভেজালের অভিযোগ উঠেছে। একই জমিতে বিভিন্ন জাতের ধান হওয়া, কোথাও ধান পেকে যাওয়া আবার কোথাও শীষ বের হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা। অনেক জমিতে শীষ শুকিয়ে যাওয়া ও পচন ধরার ঘটনাও দেখা গেছে। এতে ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কার পাশাপাশি ধান কাটা নিয়েও বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ বলছে, বিএডিসির সরবরাহ করা বীজ কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে। অন্যদিকে বিএডিসি কর্তৃপক্ষের দাবি, এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
সরেজমিনে জেলার গাংনী উপজেলার ভাটপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বর্গাচাষি আব্দুল আলীম উপজেলা কৃষি অফিস থেকে প্রণোদনার আওতায় ধান বীজ পেয়েছিলেন। তিনি যত্নসহকারে বীজতলা তৈরি, চারা রোপণ ও পরিচর্যা করে ভালো ফলনের আশা করেছিলেন। তিনি জমি প্রস্তুত, সেচ, সার ও কীটনাশক বাবদ ১ বিঘা জমিতে প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় করেন।
কিন্তু ধানে শীষ আসার সময় দেখা দেয় বিপত্তি। একই জমির কিছু গাছের ধান ইতোমধ্যে পেকে গেছে, কিছু গাছে নতুন করে শীষ বের হচ্ছে, আবার কিছু গাছ এখনও থোড় পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া অনেক শীষ শুকিয়ে গেছে এবং কোথাও কোথাও পচন ধরেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আব্দুল আলীম জানান, তার জমির প্রায় ২০ শতাংশ ধানের শীষ শুকিয়ে গেছে এবং আরও ২০ শতাংশ ধান আগাম পেকে গেছে। এতে ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন তিনি। তিনি বলেন, ধারদেনা করে ধান আবাদ করেছি। এখন যে অবস্থা দেখছি, খরচের অর্ধেক টাকাও উঠবে না। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন কৃষক হামিদুল ইসলাম ও আক্তার হোসেনও।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি প্রণোদনার বীজ অনেক সময় মৌসুমের শেষ দিকে বিতরণ করা হয়। ফলে তা কৃষকদের তেমন উপকারে আসে না। বাধ্য হয়ে অনেক কৃষক বিভিন্ন কোম্পানির উচ্চমূল্যের বীজ কিনে আবাদ করেন। তাদের দাবি, নিম্নমানের বা ভেজাল বীজ বিতরণ অব্যাহত থাকলে সরকারের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচি ব্যর্থ হতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে জেলার তিন উপজেলায় ১ হাজার ৬০০ কৃষককে প্রণোদনার আওতায় আনা হয়। তাদের মাঝে ব্রি-ধান ৮৮, ব্রি-ধান ৮৯ ও ব্রি-ধান ৯২ জাতের ৫ কেজি করে বীজ, ১০ কেজি ডিএপি এবং ১০ কেজি এমওপি সার বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়।
চলতি মৌসুমে জেলায় ১৯ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৭ হাজার ৩০০ মেট্রিক টন। তবে কৃষকদের আশঙ্কা, প্রণোদনার বীজে সমস্যা থাকায় উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হতে পারে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা বলেন, এবিষয়ে বিএডিসিই ভালো বলতে পারবে, কারণ বীজ সরবরাহ করে তারা। তবে এ ঘটনায় নানা কারণ থাকতে পারে, কৃষকদের ভুলের কারণেও এমনটি হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি জানার পর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাদের সরেজমিনে তদন্ত করে বিস্তারিত তথ্য দিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)’র মেহেরপুর অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ডিডি) আশরাফুল আলম মুঠোফোনে বলেন, বিএডিসি কৃষি অফিসে বীজ সরবরাহ করে থাকে, পরে কৃষি অফিস কৃষকদের মাঝে তা বিতরণ করে। ভেজাল বীজের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, সরকারি প্রণোদনার নামে নিম্নমানের বা ভেজাল বীজ বিতরণ বন্ধ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তা না হলে কৃষিনির্ভর মেহেরপুরে খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।