‘জোর করে কি ফলাফল খারাপ করানো যায়, জোর করে কি পাস করানো যায়’

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘদিনের নানা সংকট, শিক্ষকের ঘাটতি, করোনার পর শ্রেণিকক্ষের স্বাভাবিক পরিবেশে ব্যাঘাত এবং শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতির কারণে এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল নিম্নমুখী হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) সকালে রাজধানীর ফার্মগেটে এডুকেশন রিফর্ম ইনিশিয়েটিভের একটি অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।

তিনি বলেন, ফলাফল কমে যাওয়াকে শুধু শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এই ফলের মধ্যদিয়ে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তব চিত্র সামনে এসেছে। এখন কোথায় দুর্বলতা রয়েছে, শিক্ষার্থীরা কতটা শিখছে এবং কোন জায়গায় পরিবর্তন প্রয়োজন সেগুলো চিহ্নিত করাই গুরুত্বপূর্ণ।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, গত ২০ বছরে নানা ধরনের অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা পিছিয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে শিক্ষার মান এবং পরীক্ষার ফলাফলে। তাই ফলাফল কমে যাওয়াকে কৃত্রিমভাবে বাড়ানোর চেষ্টা না করে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থান জানা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, পরীক্ষার ফলাফল ভালো দেখানোর জন্য নম্বর বা পাসের হার বাড়িয়ে দিলে হয়তো সাময়িকভাবে একটি ইতিবাচক চিত্র পাওয়া যাবে। কিন্তু তাতে শিক্ষার্থীরা আসলে কী শিখেছে, তাদের মান কোথায় রয়েছে এবং শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা কোন জায়গায় তা জানা সম্ভব হবে না।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমি যদি শিক্ষকদের বলতাম পাসের হার বাড়িয়ে দিতে, কিংবা শিক্ষা বোর্ডগুলোকে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য বেশি শিক্ষার্থীকে পাস করিয়ে দিতে, তাহলে হয়ত ফলাফল অন্য রকম হতো। ইংরেজি, গণিত বা অন্য কোনো বিষয়ে নম্বর বাড়িয়ে দিলে পাসের হারও বেড়ে যেতে পারত। কিন্তু সে ক্ষেত্রে প্রকৃত তথ্যটি আড়ালে থেকে যেত। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত দক্ষতা ও শেখার মান সম্পর্কে বাস্তব চিত্র পাওয়া যেত না।

তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ‘রিয়েল ডেটা’ বা প্রকৃত তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষার্থীদের মান, তাদের শেখার সক্ষমতা, শিক্ষকদের ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে হবে।

এবারের এসএসসি, দাখিল ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ফলাফল নিয়েও বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে বলে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ফলাফল কমেছে এটি বাস্তবতা। কিন্তু এই পতন কেন হয়েছে, সেটি বিশ্লেষণ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘গতকাল আমাদের এসএসসি, দাখিল ও টেকনিক্যাল এডুকেশনের ফল প্রকাশ হয়েছে। এটাকে একেকজন একেক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছেন। আজ পত্রিকার শিরোনামগুলো দেখলে, নিউ এজ ছাড়া আমার মনে হয়, বিষয়টি অনেকে ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেনি। শুধু বলা হচ্ছে, ফলাফল কমেছে, গত ১৯ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি কমেছে। কিন্তু ফলাফল কমানো যায় কি? জোর করে কি ফলাফল খারাপ করানো যায়? জোর করে কি পাস করানো যায়?

আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেন, ‘রেজাল্ট ড্রপ করেছে’ এ কথা বলা সহজ। কিন্তু জোর করে ফলাফল কমানো বা বাড়ানো যায় না। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে এবং করবে। কেউ ভালো করেছে, কেউ ভালো করতে পারেনি। যারা ভালো করতে পারেনি, তাদের ব্যর্থতার পুরো দায় শুধু শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। শিক্ষাব্যবস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও নিজেদের দায়িত্ব নিতে হবে।

তিনি বলেন, একজন শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে আমাকেও দেখতে হবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জায়গাটি কতটা কার্যকর। শিক্ষার্থীদের প্রকৃত অবস্থা না জানলে কোথায় সমস্যা রয়েছে এবং কোন জায়গায় হস্তক্ষেপ প্রয়োজন, তা বোঝা সম্ভব নয়।

শিক্ষকের ঘাটতিকে শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, দেশের বিভিন্ন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। সরকারি স্কুল, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কলেজ এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সব জায়গাতেই শিক্ষকসংকট রয়েছে।

শিক্ষামন্ত্রীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি স্কুলগুলোতে প্রায় ১২ হাজার শিক্ষকের ঘাটতি রয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৩৮ হাজার শিক্ষক এবং প্রায় ৩৮ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এমপিওভুক্ত স্কুল ও কলেজেও প্রায় ৭৭ হাজার শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, এই ঘাটতিগুলো গত কয়েক মাসে তৈরি হয়নি। এগুলোর পেছনে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা ও নিয়োগসংক্রান্ত নানা সমস্যা রয়েছে। তাই বর্তমান সময়ে ফলাফল খারাপ হওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করতে হলে এই দীর্ঘদিনের সংকটগুলোকেও বিবেচনায় নিতে হবে।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়টিও তুলে ধরেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি নিয়মকানুন, গেজেট এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় চলে যায়। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ দেয়া সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, আগের সরকারের মেয়াদের শেষ সময়ে প্রায় ১৪ হাজার ৩০০ শিক্ষকের ফলাফল দেয়া হলেও তাদের পোস্টিং দেয়া হয়নি। পরবর্তী সময়ে তাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গিয়ে কয়েক মাস সময় চলে গেছে। ফলে একটি শিক্ষাবর্ষে প্রয়োজনীয় শিক্ষক সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ২০১৭ সাল থেকে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও মামলা ও আইনি জটিলতার কারণে বড় ধরনের ব্যাকলগ তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রায় ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষকের নিয়োগ আটকে ছিল। এ ধরনের জটিলতার প্রভাব সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন ও পাঠদান কার্যক্রমে পড়ে।

করোনার পর শিক্ষাব্যবস্থার স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরে আসতেও সময় লেগেছে বলে মন্তব্য করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, মহামারির কারণে দীর্ঘ সময় শ্রেণিকক্ষের শিক্ষা ব্যাহত হয়েছে। এরপরও দেশের অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকসংকট ও অন্যান্য সমস্যা পুরোপুরি কাটেনি। এসব বিষয় একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে এবারের ফলাফলের পেছনে থাকা কারণগুলো আরও স্পষ্ট হবে।

শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এত ধরনের দুর্বলতার মধ্যে থেকেও শিক্ষার্থীরা যে ফলাফল করেছে, সেটিকে শুধু নেতিবাচকভাবে দেখলে হবে না। বরং এই ফলাফল শিক্ষাব্যবস্থার কোথায় কী 


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সংসদের তৃতীয় অধিবেশন বসছে ২৭ আগস্ট

রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির প্রার্থী এখনো ঠিক হয়নি : চিফ হুইপ

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে বাংলাদেশ: বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী

অপু বিশ্বাসসহ তিন দেশের শিল্পী নিয়ে ‘শিকার’ শুরু

‘জোর করে কি ফলাফল খারাপ করানো যায়, জোর করে কি পাস করানো যায়’

ভারতের ‘র’ প্রধানের বাংলাদেশ সফর নিয়ে জল্পনার কিছু নেই: ডা. জাহেদ

ফেসবুকে অপছন্দের ব্যক্তি, আনফ্রেন্ড না করেও তার পোস্ট এড়িয়ে যাওয়ার উপায়

রাশিয়ায় ইউক্রেনের ভয়াবহ হামলা, নিহত ১৩

দেশের বাজারে আরেক দফা বাড়ল স্বর্ণের গহনার দাম, ভরি কত?

কুষ্টিয়ার জোড়া লাগা দুই শিশুর চিকিৎসার দায়িত্ব নিলো সরকার

১০

সরাসরি ২০২৭ বিশ্বকাপ নিশ্চিত হলো বাংলাদেশের

১১

হাইকোর্টের নির্দেশনায় মেট্রোরেলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে ডিএমটিসিএলের নানা পদক্ষেপ

১২