হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমান দুর্ঘটনার পর অগ্নিনির্বাপণ, যাত্রী উদ্ধার ও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা যাচাইয়ে ‘এয়ারপোর্ট ইমারজেন্সি এক্সারসাইজ (ফায়ার)-২০২৬’ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিমানবন্দরে অনুষ্ঠিত এ মহড়ায় ব্যাংকক থেকে ঢাকাগামী একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ অবতরণের ঠিক আগে ইঞ্জিনে আগুন লাগা এবং পরে রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ার কাল্পনিক পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। এরপর আগুন নিয়ন্ত্রণ, যাত্রী উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা ও আহতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম অনুশীলন করা হয়।
মহড়ার কল্পিত দৃশ্যপটে দেখানো হয়, ৯৮ জন যাত্রী ও পাঁচজন ক্রুবাহী উড়োজাহাজটি শাহজালাল বিমানবন্দরে অবতরণের ঠিক আগে ডান পাশের ইঞ্জিনে আগুন লাগে। একই সময়ে কন্ট্রোল প্যানেলে প্রযুক্তিগত ত্রুটি দেখা দিলে বিষয়টি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) টাওয়ারকে জানানো হয়।
এরপর এটিসি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট সব জরুরি সেবা সংস্থাকে অবহিত করে। বিমানবন্দরের ‘এয়ারপোর্ট ইমার্জেন্সি প্ল্যান’ কার্যকর হওয়ার পর জরুরি সেবায় নিয়োজিত বিভিন্ন সংস্থা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রস্তুতি নেয়।
পরিস্থিতির আরও অবনতির দৃশ্যে দেখানো হয়, জরুরি অবতরণের সময় উড়োজাহাজটি রানওয়ের মধ্যরেখা অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়ে নির্ধারিত অংশ অতিক্রম করে উচ্চগতিতে এগিয়ে যায়। একপর্যায়ে এটি রানওয়ের বাম দিকে ছিটকে পড়ে এবং ট্যাক্সিওয়ে সিয়েরা অতিক্রম করে রানওয়ের দক্ষিণ পাশে থেমে যায়।
দুর্ঘটনার পর উড়োজাহাজটির নিচের অংশে আগুনের সূত্রপাত হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন পুরো উড়োজাহাজে ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে বিমানবন্দরের ফায়ার সার্ভিস, এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল, উদ্ধারকারী দল, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা ঘটনাস্থলে পৌঁছে।
মহড়ায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে অগ্নিনির্বাপণ, যাত্রী উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান, আহতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম পরিচালনা করে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সংস্থার দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা, সমন্বয় এবং বিমানবন্দরের জরুরি প্রস্তুতি যাচাই করা হয়।
প্রধান অতিথি হিসেবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত মহড়া প্রত্যক্ষ করেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, বিমান চলাচলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা, প্রস্তুতি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোনও বিকল্প নেই। যাত্রীদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে যেকোনও জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রস্তুত থাকতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, নিয়মিত এ ধরনের মহড়া জরুরি প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা ও আন্তঃসংস্থা সমন্বয় আরও শক্তিশালী করবে। সফলভাবে মহড়া আয়োজনের জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহমিদা আখতার বলেন, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় দক্ষ জনবল, কার্যকর ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মাধ্যমে বিদ্যমান সক্ষমতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় উন্নয়নের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা সম্ভব।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এ মহড়া শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জরুরি প্রতিক্রিয়া সক্ষমতাকে আরও সুদৃঢ় করতে সহায়ক হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক। তিনি বলেন, নিরাপদ বিমান চলাচল নিশ্চিত করতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বাস্তবভিত্তিক মহড়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের মহড়ার মাধ্যমে জনবলের পেশাগত দক্ষতা, জরুরি সরঞ্জামের কার্যকারিতা এবং সমন্বিত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা যাচাই করা সম্ভব হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ।
মহড়ায় বেবিচক ও বিমানবন্দরের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী, এপিবিএন, ট্রাফিক উত্তরা বিভাগ, আনসার, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, কুর্মিটোলা মাল্টিকেয়ার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ ফর উইমেন, জাহানারা ক্লিনিক লিমিটেড, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা অংশ নেন।
এ ছাড়া বিমানবাহিনীর বিভিন্ন ঘাঁটির এয়ার অধিনায়ক, বেবিচকের সদস্য, বিমান, সেনা ও নৌবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিমানবন্দরে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
মহড়া শেষে বিভিন্ন পর্যায়ের কার্যক্রম মূল্যায়ন করা হয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, মহড়া থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা এবং চিহ্নিত বিষয়গুলো ভবিষ্যতে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের জরুরি ব্যবস্থাপনা ও সমন্বিত প্রতিক্রিয়া সক্ষমতা আরও উন্নত করতে সহায়ক হবে।