তার কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা, অভিনয়ে ছিল আগুন। কখনও পুলিশ কর্মকর্তা, কখনও সেনা কর্মকর্তা, কখনও সমাজের প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি; প্রতিটি চরিত্রকেই যেন নিজের শরীর ও কণ্ঠে ধারণ করতেন নানা পাটেকর। কিন্তু পর্দার সেই ‘যোদ্ধা’ পরিচয়ের বাইরেও তার জীবনে জড়িয়ে ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীর সঙ্গে এক বাস্তব অধ্যায়।
বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২৬। গোয়ার ডোনা পাওলায় নিজের বাড়িতে হৃদরোগে আক্রান্তের পর প্রয়াত হলেন প্রবীণ অভিনেতা নানা পাটেকর। বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় এবং চিকিৎসকেরা দীর্ঘক্ষণ সিপিআর দেওয়ার চেষ্টা করেন। শেষ পর্যন্ত তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
নানা পাটেকরের চলে যাওয়া শুধু বলিউড বা মারাঠি সিনেমার জন্য নয়, ভারতীয় অভিনয়জগতের জন্যই এক বড় শূন্যতা।তার অভিনয় ছিল সংলাপের চেয়ে বেশি কিছু। ছিল এক ধরনের ব্যক্তিত্ব, তীব্রতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ।
১৯৫১ সালে জন্ম নেওয়া বিশ্বনাথ পাটেকর চলচ্চিত্রজগতে নানা পাটেকর নামে পরিচিত। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবির মাধ্যমে অভিনয় শুরু করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ‘পরিন্দা’, ‘প্রহার’, ‘অঙ্গার’, ‘সালাম বম্বে’, ‘তিরঙ্গা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘খামোশি’, ‘নাটসম্রাট’, ‘ওয়েলকাম’-সহ একাধিক ছবিতে তার অভিনয় দর্শকদের মনে স্থায়ী জায়গা করে নেয়।তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ একাধিক সম্মানে ভূষিত হন তিনি।
তবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল অভিনয়ের সূত্রেই। ‘প্রহার’ ছবির প্রস্তুতির জন্য তিনি দীর্ঘ সামরিক প্রশিক্ষণ নেন। সেই প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা তার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। পরে তিনি টেরিটোরিয়াল আর্মির সঙ্গে যুক্ত হন এবং সামরিক প্রশিক্ষণও নেন।
১৯৯৯ সালের কার্গিল যুদ্ধের সময় ভারতীয় সেনার পাশে দাঁড়ানোর সুযোগও পান তিনি। মারাঠা লাইট ইনফ্যান্ট্রির সঙ্গে যুক্ত থেকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে সেনাদের সঙ্গে কাজ করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তার কার্গিল-পর্বে সেনার সঙ্গে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
কার্গিল যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বদলে দিয়েছিল তাকে। সিনেমার পর্দায় সেনার চরিত্রে অভিনয় করা আর বাস্তবে সেনাদের সঙ্গে থাকা দুই অভিজ্ঞতার পার্থক্য নানা পাটেকর নিজেও অনুভব করেছিলেন। কার্গিল-পর্বে তার অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে তিনি একবার জানিয়েছিলেন, শ্রীনগরে যাওয়ার সময় তার ওজন ছিল প্রায় ৭৬ কেজি, ফিরে আসার সময় তা কমে হয়েছিল ৫৬ কেজি।
সেনাবাহিনীর সঙ্গে তার এই সম্পর্ক পরবর্তী জীবনেও বজায় ছিল। তিনি শেষ পর্যন্ত সম্মানসূচক লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদে ভূষিত হন। তাই নানা পাটেকরের জীবনে সেনাবাহিনীর অধ্যায়টি নিছক কোনো সিনেমার প্রচারকাহিনি ছিল না; তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব অভিজ্ঞতারই অংশ ছিল।
নানা পাটেকর আর নেই। কিন্তু তার অভিনীত চরিত্র, তার কণ্ঠ, তার তীব্র সংলাপ এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই জেদ ভারতীয় সংস্কৃতি ও সমাজজীবনে তার উপস্থিতিকে দীর্ঘদিন মনে করিয়ে দেবে।