কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে চায় সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, অর্থায়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন—এই পাঁচটি খাতে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাজধানীতে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) ‘ইএসজি প্ল্যাটফর্ম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়াই সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. এম মাসরুর রিয়াজ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত ডেনমার্কের রাষ্ট্রদূত ক্রিশ্চিয়ান ব্রিক্স মোলার।
বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, করনীতিতে পাঁচ বছরের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি সহায়তা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর আওতায় মূল্যস্ফীতির হারের চেয়ে কম সুদে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা গেলে করের হার না বাড়িয়েও অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বাড়ানো সম্ভব। এতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং সুস্থ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার সুযোগ বাড়বে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সরবরাহ বৃদ্ধি এবং ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ ইউনিট (এফএসআরইউ) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে পণ্য পরিবহনের গতি বাড়ানো, রেল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগ ২০২৯ সালের মধ্যে সম্পন্ন করার প্রত্যাশা রয়েছে বলে জানান উপদেষ্টা।
ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, দেশের তরুণ ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের বাইরে থাকা মানুষের মধ্যে নারীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য। তাই নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি।
বর্তমান সরকারের সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি তুলে ধরে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর কৃষিঋণ মওকুফ, ফ্যামিলি কার্ড চালু এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ নিম্ন আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার চাপ কমাতে এবং সামাজিক সুরক্ষা জোরদার করতে সহায়তা করবে।
স্বাধীন গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যায়নের কথা উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, পাঁচ বছর ধরে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা গেলে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে। আগের সরকারের সময়ে কার্যকর পদক্ষেপের অভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে বড় সংকট মোকাবিলা করে দেশে নতুন আয়ের উৎস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হয়েছে। ১৯৭৫-পরবর্তী যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, দুর্ভিক্ষ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নতুন আয়ের উৎস ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে নারীদের আনুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচনে অগ্রগতি আসে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে পার্থক্য রয়েছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস সাধারণত এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) তুলনায় কম থাকে। বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস থাকে মাঝামাঝি অবস্থানে। তবে শেষ পর্যন্ত সংস্কার কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তার ওপর প্রবৃদ্ধির গতিপথ নির্ভর করবে।
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের বিষয়ে তিনি বলেন, উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য সময় বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা এগোচ্ছে। অতীতে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির ঘাটতি বিবেচনায় নিয়ে দেশীয় শিল্প ও অর্থনীতিকে আরও প্রস্তুত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ ক্ষেত্রে ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীর সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান তিনি।
বিজিএমইএর ‘ইএসজি প্ল্যাটফর্ম’ উদ্যোগের প্রশংসা করে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত মানদণ্ড অনুসরণ করলে শিল্প খাতে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়বে। বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের উৎপাদন খাতের গ্রহণযোগ্যতা ও সক্ষমতা বাড়াতেও এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা জোরদার এবং উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করা।