প্রায় দু’সপ্তাহেও কাটেনি গ্যাস সংকট, চরম বিপাকে বাসাবাড়ি-কারখানা

ছবি: সংগৃহীত

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) সরবরাহ কমে যাওয়ায় দেশে গ্যাস সংকট আরও তীব্র হয়েছে। প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে গ্যাসের তীব্র সংকট চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের কারণে বর্তমানে দেশে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। এতে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক খাতে সংকট বেড়েছে।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে দেশে দৈনিক ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২ হাজার ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। অন্যদিকে দেশে প্রতিদিন গড়ে গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি থাকছে বিপুল পরিমাণ।

শুধু এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়াই নয়, কমছে দেশের স্থানীয় গ্যাস উৎপাদনও। পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন প্রায় ১৫ কোটি ঘনফুট কমে যাচ্ছে। পুরোনো কূপ সংস্কার করেও প্রত্যাশিত পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। দেশের বৃহৎ গ্যাস সরবরাহকারী মার্কিন কোম্পানি শেভরনের উৎপাদনও প্রতিবছর কমছে। কোম্পানিটির গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে বছরে গড়ে ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট উৎপাদন কমে যাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত স্থানীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদনও কমছে প্রায় ৩০ মিলিয়ন ঘনফুট।

পেট্রোবাংলার গ্যাস উৎপাদন প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের প্রথম সপ্তাহে শেভরনের বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র থেকে দৈনিক ৮১৫ থেকে ৮২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। ২০ থেকে ৩০ জুলাইয়ের হিসাবে তা নেমে এসেছে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে। অর্থাৎ সাড়ে চার মাসের ব্যবধানে সরবরাহ কমেছে প্রায় ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, এলএনজির ভাসমান টার্মিনাল মেরামতের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে কারিগরি টিম। তবে কবে নাগাদ এটি কার্যক্রমে আসবে, তা এখনই সুনির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।

স্থানীয় গ্যাস উৎপাদন পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কূপগুলো থেকে প্রত্যাশিত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। শেভরনের উৎপাদনসহ স্থানীয় কোম্পানিগুলোর উৎপাদনও কমছে। অন্যদিকে গ্যাস আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রেও অবকাঠামোগত সংকট রয়েছে।

এদিকে এলএনজির বৈশ্বিক বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। জাপান-কোরিয়া মার্কেটে এলএনজির দাম প্রতি মিলিয়ন ব্রিটিশ থার্মাল ইউনিটের (এমএমবিটিইউ) ২১ ডলার ৪৫ সেন্টের ওপরে উঠেছে। গত ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে এ দাম ছিল ১০ ডলার ৬০ সেন্ট। ফলে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি এখন আগের তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করছে কাতার এনার্জি। কাতার থেকে প্রতিবছর ৪০ কার্গো এলএনজি আমদানি হয়। দেশটির এলএনজি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আগামী তিন-চার বছর চুক্তির অর্ধেক কার্গো এলএনজি বাংলাদেশে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

সব মিলিয়ে গ্যাস খাতে দুই ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একদিকে কমছে স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদন, অন্যদিকে বাড়ছে এলএনজির দাম এবং কমছে সরবরাহ। ফলে দ্রুত সংকট কাটানোর সহজ কোনো পথ নেই বলে মনে করছেন তারা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, চলমান পরিস্থিতি একদিনের তৈরি নয়। অতীতে গ্যাস সংকট সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলা হলেও সেগুলো যথাযথভাবে আমলে নেয়া হয়নি। এখন অর্থ ও অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি স্থানীয় গ্যাসের উৎপাদনও কমছে।

তার মতে, সাময়িকভাবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি আমদানি করা যেতে পারে। তবে এতে ব্যয়ের বিষয় রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব গ্যাস উৎপাদনের বিকল্প নেই। শেভরন বাংলাদেশের গ্যাসকূপগুলোতে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিতে চাইলে সরকার তা গ্রহণ করলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে ১০০টি কূপ খননের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চলছে। মহেশখালীর কুতুবজোমে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেডের প্রস্তাব জিটুজি পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান থেকে আগামী ১৩ বছর এলএনজি আমদানিরও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।

এছাড়া গ্যাস সংকট নিরসনে সহায়তা চেয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

গ্যাসের তাৎক্ষণিক সংকট মোকাবিলায় পুরোনো কূপ থেকে গ্যাস পাওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, পুরোনো কূপে গ্যাস পাওয়া গেলে সেটিই হবে গ্যাস সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান। পাইপলাইনের মাধ্যমে দ্রুত সেই গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

তিনি জানান, গ্যাস সংকট মোকাবিলায় মালয়েশিয়া থেকে ক্রায়োজনিক আইএসও ট্যাংক আগামী অক্টোবরের মধ্যে দেশে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব ট্যাংকের মাধ্যমে এলএনজি পরিবহন করা হবে। একইভাবে ভোলার গ্যাস এসব ট্যাংকের মাধ্যমে এনে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পপ্রতিষ্ঠানে আগামী ফেব্রুয়ারি থেকে সরবরাহের উদ্যোগ রয়েছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্যাস খাতে নেয়া এসব পরিকল্পনার বেশিরভাগই দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল। বাস্তবায়নে তিন থেকে চার বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। ফলে চলমান সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণের পথ এখনো সরকারের হাতে নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

পুলিশ কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনী নয়: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ভারতে ফের বিক্ষোভের উত্তাপ, মোদির বাসভবন অভিমুখে মিছিলের ডাক

প্রায় দু’সপ্তাহেও কাটেনি গ্যাস সংকট, চরম বিপাকে বাসাবাড়ি-কারখানা

দেশজুড়ে পুলিশের জরুরি সতর্কতা জারি

হামলা হলে পুরো অঞ্চলকে প্রস্তর যুগে ফিরিয়ে দেব, বোকামি না করাই ভালো

‘আগামী সপ্তাহে বাংলাদেশে আসবে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের ৪৫ ব্যবসায়ী’

‘আয়নাঘরে’ যারা দেয়াল টেনেছে তাদের বিচারের আওতায় আনছি: চিফ প্রসিকিউটর

মিরপুর-১০ ও ফার্মগেট মেট্রো স্টেশনে পাওয়া বোমা সদৃশ বস্তু বোমা নয়: ডিএমপি

বর্তমান সংসদ ‘মজলুমের সংসদ’, জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার

র‍্যাবের ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনে ট্রাইব্যুনালের বিচারক-প্রসিকিউশন

১০

এবার মিরপুর মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে বোমাসদৃশ বস্তু ঘিরে রেখেছে পুলিশ

১১

বগুড়ায় ট্রাক-পিকআপ সংঘর্ষে নিহত ৪

১২