বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে কালেমাখচিত পতাকা মিছিল, নেপথ্যে কী?

ছকিব: সংগৃহীত

দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে কালেমাখচিত সাদা-কালো পতাকা নিয়ে মিছিল, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা ও বিভিন্ন স্থাপনায় পতাকা টাঙানোর ঘটনা বেড়েছে। আয়োজকদের কেউ এটিকে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ বললেও, পতাকার নকশা নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। কারণ, একই ধরনের পতাকা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কয়েকটি উগ্রবাদী সংগঠনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত বলে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করছেন। এ নিয়ে ধর্মীয়, সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা সংশ্লিষ্ট নানা আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলা বলছে, মাদারীপুর শহরের মডেল মসজিদ মোড়ে সম্প্রতি আসরের নামাজের পর জড়ো হন প্রায় দেড় শতাধিক মুসল্লি। তাদের অনেকের হাতেই ছিল কালেমাখচিত সাদা ও কালো রঙের পতাকা। কিছুক্ষণ পর মডেল মসজিদের সামনে থেকে মোটরসাইকেল র‍্যালি বের হয়। প্রতিটি মোটরসাইকেলে দুই বা তিনজন করে আরোহী ছিলেন। কয়েকজনের হাতে ছিল হ্যান্ডমাইক।

স্লোগান দিতে দিতে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি। পরে আবার মডেল মসজিদের সামনে ফিরে এসে সংক্ষিপ্ত সমাপনী অনুষ্ঠান করা হয়। মোটরসাইকেল র‍্যালি প্রায় এক ঘণ্টা চললেও সমাপনী অনুষ্ঠান ছিল দেড় মিনিটের মতো। তড়িঘড়ি করেই অনুষ্ঠান শেষ করে চলে যান অংশগ্রহণকারীরা। সমাপনী বক্তব্যে ফখরুদ্দিন রাজী নামে একজন বলেন, তারা যে পতাকা নিয়ে মিছিল করেছেন, সেটিই ‘মুসলিমদের পতাকা’।

মিছিলে অংশ নিয়ে নিজেকে স্থানীয় একটি মসজিদের ইমাম হিসেবে পরিচয় দেয়া তরিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি সাংবাদিকদের বলেন, দেশে যেহেতু ফুটবলকে ঘিরে বিভিন্ন দেশের পতাকা টাঙানো হচ্ছে এবং মিছিল হচ্ছে, তাই মুসলমানদের ‘ইসলামের নিশানা’ কোনটি, তা বোঝাতেই তারা এই র‍্যালির আয়োজন করেছেন।

তবে শুধু মাদারীপুরেই নয়, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে কালেমাখচিত পতাকা নিয়ে মিছিল ও সমাবেশ দেখা গেছে। অনেক জায়গায় অংশগ্রহণকারীরা এটিকে ইসলামের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ বলে দাবি করলেও পতাকার রঙ ও নকশা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। কারণ এসব পতাকার সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কিছু জঙ্গি বা উগ্রবাদী সংগঠনের ব্যবহৃত পতাকার মিল রয়েছে।

বাংলাদেশেও এর আগে এ ধরনের পতাকা নিয়ে মিছিল ও জমায়েত হয়েছে। এদিকে এসব পতাকা টানানোর সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করায় ঢাকার একটি গণমাধ্যমকে হুমকি দেয়ার অভিযোগও উঠেছে।

গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকার যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারে কালেমাখচিত পতাকা টানানোর ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আলোচনায় আসে। ১৬ জুন মধ্যরাতে একদল যুবক ফ্লাইওভারের বিভিন্ন স্থানে এসব পতাকা টাঙান।

পরদিন সেগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর পতাকা সরিয়ে ফেলার ঘটনাকে ‘ইসলামের পতাকার অবমাননা’ বলে উল্লেখ করে আবারও সেখানে পতাকা টাঙানো হয়। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে ‘ইসলামের পতাকার মর্যাদা রক্ষার’ দাবিতে মিছিলও হয়।

যাত্রাবাড়ীর ঘটনায় স্থানীয় কিছু তরুণ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের নাম সামনে আসে। এসময় বিভিন্ন ফেসবুক পেজ থেকেও কালেমাখচিত পতাকা টাঙানোর আহ্বান ও পতাকা বিক্রির পোস্ট ছড়িয়ে পড়ে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামের কি আদৌ কোনও নির্দিষ্ট পতাকা আছে?

এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পরিচালক ও ইসলামী গবেষক মো. আনিসুজ্জামান সিকদার বলেন, ইসলামে নির্দিষ্ট কোনও পতাকার কথা উল্লেখ নেই।

তিনি বলেন, ‘ইসলামের নামে যদি কোনো নির্দিষ্ট পতাকা থাকত, তাহলে সবাই সেটিই ব্যবহার করত। কোনও আলেম কখনও বলেননি যে, এটি বা ওটি ইসলামের পতাকা। রাসুল (সা.) যুদ্ধের সময় পতাকা ব্যবহার করেছেন, তবে বিভিন্ন যুদ্ধে বিভিন্ন রঙের পতাকা ছিল। ইসলামী ঐতিহ্যে নির্দিষ্ট কোনও পতাকার উল্লেখ পাওয়া যায় না।’

যেখানে ইসলামে নির্দিষ্ট কোনও পতাকার উল্লেখ নেই, সেখানে দেশের বিভিন্ন স্থানে হঠাৎ করে এসব পতাকাকে ‘ইসলামের পতাকা’ দাবি করে মিছিল কেন হচ্ছে—এ প্রশ্নও উঠেছে। এ ক্ষেত্রে দুটি বিষয় সামনে এসেছে। প্রথমটি হলো ফুটবল বিশ্বকাপ। এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে সারাদেশে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশের পতাকা টাঙিয়েছেন ফুটবলপ্রেমীরা। বিশেষ করে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকা প্রায় সর্বত্রই দেখা যাচ্ছে।

দ্বিতীয় বিষয়টি হলো, বিদেশি পতাকা টাঙানোর বিরুদ্ধে ইসলামপন্থিদের একটি অংশের অবস্থান। এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি কওমি মাদ্রাসার শিক্ষক ও হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মুফতি হারুন ইজহারের একটি বক্তব্য। সেখানে ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে বিদেশি পতাকার পাশাপাশি কালেমাখচিত পতাকা টাঙানোর আহ্বান জানাতে দেখা যায় তাকে।

যোগাযোগ করা হলে হারুন ইজহার বলেন, বক্তব্যটি তারই। ভিডিওটি গত ১৩ জুন ‘আল কুরআনের দারস’ নামে একটি ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা সব জায়গায় কালেমার পতাকা লাগিয়ে দিন। যদি এটাকে জঙ্গিবাদ বলা হয়, তাহলে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের পতাকাও নামাতে হবে। যেখানে ওগুলোর পতাকা থাকবে, সেখানে আমাদের কালেমার পতাকাও থাকবে।’

এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ার পরের দিনগুলোতেই দেশের বিভিন্ন স্থানে সাদা-কালো কালেমাখচিত পতাকা ওড়ানো, মিছিল, শোভাযাত্রা এবং ফ্লাইওভার, সেতু ও কালভার্টে পতাকা টাঙানোর ঘটনা বাড়তে থাকে। তবে এসব কর্মসূচির আয়োজন কারা করছেন বা পতাকা কারা টাঙাচ্ছেন, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট হয়নি। পাশাপাশি পতাকার রঙ ও লেখার ধরন নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

বাংলাদেশের গুম কমিশনের সাবেক সদস্য ও মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন দীর্ঘদিন ধরে দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে যে ধরনের পতাকা ব্যবহার করা হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের ব্যবহৃত পতাকার মিল রয়েছে। তার ভাষায়, ‘আল-কায়েদার প্রশিক্ষণ শিবির, নাইজেরিয়ার বোকো হারাম, আইএস—সব জায়গাতেই এই ধরনের পতাকা দেখা যায়। বাংলাদেশে অতীতে হরকাতুল জিহাদসহ বিভিন্ন সংগঠনও এই পতাকা ব্যবহার করেছে। এখন এটি ব্যবহার করছে হিযবুত তাহরীর।’

তার মতে, একটি গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে এসব পতাকা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ‘পতাকায় কালেমা লেখা থাকায় একজন মুসলমান স্বাভাবিকভাবেই এটিকে


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

চেক রিপাবলিক ও স্লোভাকিয়া সফর শেষে দেশে ফিরেছেন সেনাপ্রধান

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে কালেমাখচিত পতাকা মিছিল, নেপথ্যে কী?

হাম ও উপসর্গে একদিনে আরও ৫ জনের মৃত্যু

‘মেসির বিদায় নিয়ে ভাববেন না, তাকে উপভোগ করুন’

গণতন্ত্রের সফলতা নির্ভর করে স্বাধীন গণমাধ্যমের ওপর: মির্জা ফখরুল

বান্দরবানের রেতলাং এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান চলমান

দেশের বাজারে স্বর্ণের দামে ফের বড় লাফ, ভরিতে বাড়ল ৪৩৭৪ টাকা

স্কুল ফিডিংয়ে নিম্নমানের ডিম, প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে দ্রুত ব্যবস্থা

সশস্ত্র বাহিনীর দেড়শ কর্মকর্তাকে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত সরকারের

ইউক্রেনে রাশিয়ার ব্যাপক হামলা,নিহত ২৭

১০

খামেনির জানাজায় অংশ নিতে পারে ২ কোটি মানুষ

১১

নাটকীয় লড়াইয়ে ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে শেষ ষোলোয় রোনালদোর পর্তুগাল

১২