বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গবেষণায় স্বতন্ত্র ইনস্টিটিউশন গঠনের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার

ছবি : সংগৃহীত।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন, গবেষণা এবং নীতিনির্ধারণকে প্রাতিষ্ঠানিক ও শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে একটি স্বতন্ত্র গবেষণা ইনস্টিটিউশন গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। 

তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, এই গবেষণা প্রতিষ্ঠান কোনও মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়, বরং একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা (২০২৬-২০৫০) উপস্থাপন করে। 

সভায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

উপস্থাপিত মহাপরিকল্পনায় জানানো হয়, এর মূল লক্ষ্য হলো দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করা, জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা, খাতভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের সব মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।

সভায় আগের তিনটি মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে বিদ্যমান পলিসি গ্যাপগুলো চিহ্নিত করা হয়। নতুন মহাপরিকল্পনাটি তিন ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। প্রথম ধাপ ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল, দ্বিতীয় ধাপ ২০৩০ থেকে ২০৪০ সাল এবং তৃতীয় ধাপ ২০৪০ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত থাকবে।

২০২৬ থেকে ২০৩০ সময়কালে ফার্স্ট ট্র্যাক প্রায়োরিটি প্রকল্প হিসেবে অফশোর অনুসন্ধান রাউন্ড, গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি সরবরাহ নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, রিফাইনারি সক্ষমতা সম্প্রসারণ এবং কৌশলগত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে অফশোর গ্যাস উন্নয়ন, বৃহৎ পরিসরে রিফাইনিং ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সম্প্রসারণ, হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়া অবকাঠামো গড়ে তোলা, ভূ-তাপীয় শক্তি উন্নয়ন এবং জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্র তরঙ্গভিত্তিক নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়।

সভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সার্বিক চিত্র উপস্থাপনের জন্য সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ এই খাতেই নিহিত। এই খাত শক্তিশালী হলে দেশের অর্থনীতি দাঁড়াবে এবং প্রতিটি মানুষের জীবনমান সরাসরি প্রভাবিত হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি গবেষণার জন্য পৃথক ইনস্টিটিউশন গঠনের বিষয়ে তিনি বলেন, গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য একটি আলাদা ইনস্টিটিউট প্রয়োজন, যা কোনো মন্ত্রণালয়ের অধীন হবে না। 

এটি একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে এবং বিশ্বজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখবে। একই সঙ্গে এই প্রতিষ্ঠান নীতিনির্ধারণে সরকারকে বৈজ্ঞানিক ও তথ্যভিত্তিক সহায়তা দেবে।

অতীতের উদ্যোগগুলোকে খাপছাড়া উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, শুরু থেকেই নতুনভাবে চিন্তা করতে হবে। এতদিন যেভাবে হয়ে আসছে, শুধু সেই ধারাবাহিকতার কারণেই একই পথে যেতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। অনেক ক্ষেত্রে ভুল লোকেশন ও ভুল কাঠামোর কারণে সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন এমন না ঘটে, সে জন্য একটি সুস্পষ্ট কাঠামো ও নিয়মের মধ্যে কাজ করতে হবে, আর সেজন্য গবেষণাকেন্দ্র অত্যন্ত জরুরি। তিনি বিকল্প জ্বালানি উৎস নিয়েও গভীর গবেষণার নির্দেশ দেন।

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, এই মহাপরিকল্পনায় জ্বালানি খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি কীভাবে দক্ষতা বাড়িয়ে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করে জলবায়ু প্রভাব কমানো সম্ভব, সেই দিকটি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এই রূপান্তরের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনাও দেখানো হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা বর্তমান প্রায় ১৭ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ৫৯ গিগাওয়াটে পৌঁছাবে। এতে পরিবেশগত ও সামাজিক চাপ বাড়বে, তবে পরিচ্ছন্ন ও অধিক দক্ষ প্রযুক্তির ব্যবহারে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ ০.৬২ টন থেকে কমে ০.৩৫ টন CO₂/মেগাওয়াট-ঘণ্টায় নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

জলবায়ু সংশ্লিষ্ট উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে ২০৫০ সালের মধ্যে বছরে প্রায় ৬৪.৫ মিলিয়ন টন এবং মোট প্রায় ১,৬০০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাসের সম্ভাবনার কথাও মহাপরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ যা কুইক রেন্টাল আইন নামে পরিচিত-বাতিল করা হয়েছে। পাশাপাশি মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫, রিনিউএবল এনার্জি পলিসি ২০২৫, রুফটপ সোলার প্রোগ্রাম ২০২৫ এবং নেট মিটারিং গাইডলাইন ২০২৫ গ্রহণ করা হয়েছে।

সভায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, ট্রান্সমিশন ও বিতরণব্যবস্থা, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সাস্টেইনেবিলিটি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিয়ে একাধিক সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে প্রাইমারি এনার্জি সেক্টরকে আরও নিরাপদ, দক্ষ, কম আমদানিনির্ভর এবং আর্থিকভাবে টেকসই করে তোলা।

মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৫০ মেয়াদে জ্বালানি খাতে ৭০ থেকে ৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ১০৭.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

দেশের বাজারে আরও কমল স্বর্ণের দাম

সরকারের ফ্যাসিস্ট হওয়ার পথ বন্ধ করতেই গণভোট : আলী রীয়াজ

ভারতীয়দের পর্যটক ভিসা দেওয়া ‘সীমিত’ করল বাংলাদেশ

রাজধানীর ৯ স্থানে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ডিএমপির গণবিজ্ঞপ্তি

শরীয়তপুরে বোমা বিস্ফোরণে আরও একজনের মৃত্যু

চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বড় পদক্ষেপ সরকারের

এলপিজি ব‍্যবসায়ীদের ধর্মঘট প্রত‍্যাহার

বাংলাদেশিদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভিসা বন্ড’ আরোপ দুঃখজনক : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

নোয়াখালীকে টানা ৬ বার হারালো রাজশাহী

মালয়েশিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার

১০

পাল্টা জবাব নয়, শত্রুপক্ষ আঘাত হানার আগেই হামলা চালাবে ইরান

১১

জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি দিতে অধ্যাদেশের খসড়া তৈরি: আসিফ নজরুল

১২