বাংলাদেশে ফুটবলের প্রথম আবেগ ব্রাজিল। প্রথম প্রেমের মতো যার ছায়া দোলা দেয় আজও। যে সময়ে ঘরে ঘরে টিভি পৌঁছায়নি তখন ফুটবলের সমার্থক হয়ে উঠেছিল দেশটি। নেপথ্যে ছিল পঞ্চম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে ফুটবলের রাজা পেলেকে নিয়ে লেখা একটি গল্প। এই বদ্বীপে ৭০–৮০’র দশকে জন্ম নেওয়া প্রতিটি ছেলেমেয়ে বুঝেছে ফুটবল খেলা মানে ব্রাজিল আর পেলে হলেন তার রাজা। কে না জানে প্রথম প্রেম ভোলার নয়। তাই তো সমর্থকদের কাছে ব্রাজিলের খেলা চোখের নেশা। গাড় হলুদ জার্সি পরে প্রিয় দলের খেলা দেখার সময় ম্যাচের গভীরে ডুব দেন তারা। রাফিনিয়া, ভিনিসিয়ুসদের মাঝে নিজের ছায়া দেখতে পান প্রত্যেকে। ব্রাজিলের সমর্থকদের পাগলপনা বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থকদের ঐতিহ্য। এই বিশ্বকাপে মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের ড্র করা মেনে নেওয়া ছিল নিদারুণ। ভিনিসিয়ুসদের কাছ থেকে মন ভরানোর মতো একটি ম্যাচ না দেখা পর্যন্ত স্বস্তি নেই। হাইতির বিপক্ষে সেই উচ্চমানের ফুটবল প্রদর্শনী দেখতে না পেলে সমর্থকদের হৃদয় আরও একবার ক্ষতবিক্ষত হবে বিষণ্নতার ক্যাকটাসে।
বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা এই দুই শিবিরে বিভক্ত ফুটবলের সিংহভাগ সমর্থক। লিওনেল মেসি ভিনগ্রহের ফুটবল খেলে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো নতুন প্রজন্মের একটা বড় অংশকে টেনে নিয়েছেন আর্জেন্টিনার দিকে। ব্রাজিল সমর্থকরা সেখানে পরীক্ষিত নবীনে-প্রবীণে শিশু-কিশোরে আপনে আপন। এই প্রেম আবেগের কতটা অতলান্তে তা দেখা যায় সামাজিক মাধ্যমে প্রবেশ করলে। এক কিশোর তার নিজের ফেসবুক পেজের দেয়ালে লিখেছে, ‘ফুটবল কবিতা হলে সেই কবিতার ছন্দ ব্রাজিল। ফুটবল বিশাল আকাশ হলে সে আকাশের সূর্য ব্রাজিল।’ যে ছেলেটির এই চার চরণ লেখা তার বয়স বড় জোড় ১৫ বছর। অথচ ব্রাজিল শেষবার বিশ্বকাপ শিরোপা জিতেছে ২০০২ সালে। তবুও তিকিতিকা তথা পেলে-রোমারিও-রোনালদোর উত্তরসূরিদের পায়ের জাদু দেখার ভক্তকুল বেড়েই চলে। অলিখিত সংবিধানের মতো একটি সংবিধান থাকতে পারে ব্রাজিল ফুটবল সমর্থকদের। যেখানে সদস্যপদ পাওয়ার একমাত্র যোগ্যতা ব্রাজিলের ফুটবলকে ভালোবাসা জয়ে–পরাজয়ে।
এই বিশ্বকাপ শুরুর আগে কক্সবাজারে বিশাল সমাবেশ করে এসেছেন ব্রাজিল সমর্থকরা। ঢাকায় শোভাযাত্রা করতে দেখা গেছে আর্জেন্টাইন সমর্থকদেরও। উন্মাদনায় গাঢ় হয় সমর্থক প্রেম। আলজেরিয়ার বিপক্ষে লিওনেল মেসি হ্যাটট্রিক করার ম্যাচে পার্লামেন্টের বিরোধী দলের মতো অনেক ব্রাজিল সমর্থক খেলা দেখতে বসেছিলেন আর্জেন্টিনার হার দেখতে। কাল শনিবার সকাল সাড়ে ৬টায় ফিলাডেলফিয়ায় ব্রাজিল যখন হাইতির মুখোমুখি হবে তখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ায় থাকবে হলুদের ঢেউ। ব্রাজিল সমর্থকদের সঙ্গে আর্জেন্টাইন সমর্থকরাও টিভি সেটের সামনে থাকবেন হাইতির সমর্থক হয়ে। এ দেশের ফুটবল সমর্থকদের এই সৌন্দর্য অপরূপ।
এই বিশ্বকাপে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, স্পেন, ফ্রান্সের মতো বড় দল গণ্য করা হচ্ছে মরক্কোকে। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের সাত নম্বরে থাকা মরক্কো ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ শেষ করেছে সেমিফাইনালে। আশরাফ হাকিমিরা আগের থেকেও শক্তিশালী। তাদের বিপক্ষে ভিনিসিয়ুসের গোলে ড্র (১-১) করতে পারাও ভালো ফল। হ্যাঁ, ব্রাজিলের কাছে যে মানের ফুটবল খেলা আশা করা হয় তা ছিল না প্রথম ম্যাচে। আশা করা হচ্ছে হাইতির বিপক্ষে ভালো ফুটবল খেলে নকআউট পর্বের প্রস্তুতিটা সেরে নেবে সেলেসাওরা। প্রথম ম্যাচের অভিজ্ঞতা থেকে কোচ কার্লো আনচেলেত্তি একাধিক পরিবর্তন আনতে পারেন একাদশে। বিশ্বকাপে সেরা কম্বিনেশন খুঁজে পাওয়ার জন্য কালও একটু-আধটু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারেন কোচ। ব্রাজিলের ফরোয়ার্ড লাইনে যথেষ্ট ভালো খেলোয়াড় রয়েছে। যা একটু টান পড়ছে ডিফেন্স ও মাঝমাঠে। এই দুই জায়গার ছিদ্র বন্ধ করার জন্য বিকল্প বেছে নিতে পারেন কোচ। এই উদীয়মান তারকাদের সঙ্গে পরীক্ষিত নেইমার জুনিয়র যেদিন একাদশে থাকবেন সেদিন দেখা মিলবে আসল ব্রাজিলের। রিও ডি জেনেরিওর দল ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনের মতো সেদিন বিশ্বজুড়েই হবে উল্লাসের চিৎকার।