“এই পৃথিবীতে শিক্ষার আলো নেই, কিন্তু শিক্ষা রয়েছে”—এই বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে এক তরুণের নিরলস প্রচেষ্টায় পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ধুলাউড়ি গ্রামে গড়ে উঠেছে ব্যতিক্রমী এক পাঠাগার— “সবার জন্য পড়া উন্মুক্ত পাঠাগার”।
পাবনা জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০-৩৫ কিলোমিটার দূরে এবং উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের প্রত্যন্ত গ্রাম ধুলাউড়ির পূর্ব পাড়ায় প্রতিষ্ঠিত এই পাঠাগারটি আজ গ্রামবাসীর জন্য জ্ঞানের এক আলোকবর্তিকা হয়ে উঠেছে।
পাঠাগারটির প্রতিষ্ঠাতা মোঃ শাহাদত হোসেন জানান, ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। জীবনের কঠিন বাস্তবতা—মায়ের অকাল মৃত্যু, দারিদ্র্য, সংসারের দায়িত্ব—সবকিছুর মাঝেও তিনি বইকে আঁকড়ে ধরেছেন। কর্মজীবনে প্রবেশের পর বই সংগ্রহের অভ্যাস গড়ে ওঠে এবং ধীরে ধীরে নিজের সংগ্রহে শত শত বই জমা হতে থাকে।
করোনাকালীন সময়ে কর্মস্থল বন্ধ হয়ে গ্রামে ফিরে এসে তিনি লক্ষ্য করেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তখনই নিজের সংগ্রহে থাকা প্রায় ৫০০ বই দিয়ে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। স্থানীয়দের সহযোগিতায় শুরু হয় “সবার জন্য পড়া উন্মুক্ত পাঠাগার”-এর পথচলা। বর্তমানে পাঠাগারটিতে বইয়ের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩০০০-এরও বেশি।
পাঠাগারটি পরিচালনার জন্য রয়েছে ১০ সদস্যের একটি কমিটি এবং দুইজন লাইব্রেরিয়ান। এখানে কোনো সদস্য বা পাঠকের কাছ থেকে কোনো ফি নেওয়া হয় না। প্রতিষ্ঠাতা নিজ অর্থায়নে বই সংগ্রহ, বুকশেলফ তৈরি এবং বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকেন।
এই পাঠাগারের মাধ্যমে নিয়মিত পাঠচক্র, বইপড়া কর্মসূচি, জাতীয় দিবস পালন, শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ এবং ঈদে অসহায়দের সহায়তা প্রদান করা হয়। এছাড়া পাঠকদের উৎসাহিত করতে সেরা পাঠক, সেরা আবৃত্তিকারসহ বিভিন্ন পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে।
প্রতিষ্ঠাতা শাহাদত হোসেন বলেন, “পাঠাগার হলো মানবিক ও নৈতিক মানুষ তৈরির কারখানা। একটি ভালো বই মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে যায়। তাই তরুণ প্রজন্মকে বইমুখী করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।”
তিনি আরও জানান, এখনো পর্যন্ত কোনো সরকারি বা বড় ধরনের অনুদান না পেলেও বিভিন্ন ব্যক্তি, লেখক ও প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৩৮৩টি বই উপহার পাওয়া গেছে। ভবিষ্যতে পাঠাগারটির অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সরকারি নিবন্ধনের জন্য কাজ চলছে।
স্থানীয়দের মতে, এই পাঠাগার ইতোমধ্যে গ্রামে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ বাড়ছে এবং তারা ধীরে ধীরে মোবাইল নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসছে।
সমাজে নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে এই উদ্যোগ একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। শিক্ষা অনুরাগী সকলের সহযোগিতায় এই পাঠাগার আরও এগিয়ে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।