হাওয়াইয়ের দিকে ধেয়ে আসছে ক্যাটাগরি-১ মাত্রার হারিকেন ‘লালা’। প্রবল বাতাস ও ভারী বৃষ্টিপাত নিয়ে ঝড়টি অঙ্গরাজ্যটির দিকে এগিয়ে যাওয়ায় বন্যা, ভূমিধস ও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে হাওয়াইয়ে ৪২ হাজারের বেশি গ্রাহক বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েছেন। পরিস্থিতিকে ‘জীবন-হুমকিপূর্ণ’ উল্লেখ করে সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টার।
পাওয়ারআউটেজ ডটকমের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় সময় শনিবার দুপুর ২টা ১৪ মিনিট পর্যন্ত হাওয়াইয়ে ৪২ হাজার ৮৮৯ জন গ্রাহক বিদ্যুৎহীন ছিলেন। এর মধ্যে বিগ আইল্যান্ডের ৩১ হাজার ৭৯২ এবং মাউই কাউন্টির ৭ হাজার ২০৩ জন গ্রাহক রয়েছেন।
ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিগ আইল্যান্ডে ১০ থেকে ২০ ইঞ্চি বৃষ্টিপাত হতে পারে। কোনো কোনো এলাকায় বৃষ্টির পরিমাণ ২৫ ইঞ্চি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। পূর্ব মাউইয়ে ৮ থেকে ১২ ইঞ্চি এবং পশ্চিম মাউইয়ে ৪ থেকে ৬ ইঞ্চি বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। অতিবৃষ্টির কারণে বিশেষ করে পাহাড়ি ও খাড়া ঢালু এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে।
এর আগে ‘লালা’র সর্বোচ্চ স্থায়ী বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৭৫ মাইল বা ১২০ কিলোমিটারে পৌঁছায়। এতে ঝড়টি ক্যাটাগরি-১ হারিকেনে পরিণত হয়। বিভিন্ন এলাকায় দমকা বাতাসের গতি আরও বেশি ছিল। বিগ আইল্যান্ডের মাউনাকেয়া ওয়েদার সেন্টারে ঘণ্টায় ১০০ মাইলের বেশি বেগে দমকা বাতাস রেকর্ড করা হয়েছে।
ঝড়টির সরাসরি আঘাতের আশঙ্কায় কয়েক দশকের মধ্যে বড় ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে হাওয়াই। ১৯৯২ সালের শক্তিশালী ক্যাটাগরি-৪ হারিকেন ‘ইনিকি’র পর অঙ্গরাজ্যটিতে আর কোনো বড় হারিকেন সরাসরি আঘাত করেনি। ‘লালা’ বিগ আইল্যান্ডের দক্ষিণ প্রান্ত ঘেঁষে অতিক্রম করতে পারে অথবা সরাসরি আঘাত হানতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এরপর এটি পশ্চিম দিকে এগিয়ে অন্যান্য দ্বীপের কাছ দিয়ে অতিক্রম করতে পারে।
হাওয়াইয়ের গভর্নর জশ গ্রিন বাসিন্দাদের প্রবল বৃষ্টিপাত, ক্ষতিকর বাতাস, আকস্মিক বন্যা ও বিপজ্জনক সমুদ্রের ঢেউয়ের জন্য প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বিগ আইল্যান্ডের বিভিন্ন এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রেখেছে এবং বাসিন্দাদের আগেই প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরামর্শ দিয়েছে।
ঝড়ের প্রভাবে বিদ্যুৎ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিগ আইল্যান্ডের হামাকুয়া উপকূলে গাছ পড়ে কয়েকটি বিদ্যুতের খুঁটি ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা প্রায় ৪২ মাইল বা ৬৭ দশমিক ৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সঞ্চালন লাইনের অবস্থা পর্যালোচনা করছেন। হাওয়াইয়ান ইলেকট্রিক জানিয়েছে, ঝড়ের প্রভাবে কিছু এলাকায় দীর্ঘ সময়, এমনকি রাতভর বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকতে পারে।
ঝড়ের কারণে হাওয়াইয়ের যোগাযোগব্যবস্থাতেও প্রভাব পড়েছে। হিলো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং এলিসন ওনিজুকা কোনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাতিল হয়েছে বহু ফ্লাইট। ফ্লাইটঅ্যাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী, কোনা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রায় ৪০ শতাংশ এবং হিলো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রায় ৮০ শতাংশ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। হাওয়াই দ্বীপ, মাউই কাউন্টি ও কাউয়াইয়ের বাণিজ্যিক বন্দরও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিস জানিয়েছে, ভারী বৃষ্টির কারণে কোথাও কোথাও মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং উদ্ধারকাজ চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। নদী ও উপনদীর পানি দ্রুত বেড়ে তীর উপচে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
স্থানীয় আবহাওয়াবিদ জেনিফার মায়ার্স জানিয়েছেন, ভূমিধসের কারণে কিছু সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং গাছ পড়ে বিদ্যুতের লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হিলো এলাকায় ওয়াইলুকু নদীর পানিও স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়েছে বলে তিনি জানান।
হাওয়াইয়ের বাসিন্দারাও ঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর রক্ষায় বালির বস্তা প্রস্তুত করা হয়েছে এবং স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
১৯৯২ সালে হাওয়াইয়ে আঘাত হানা হারিকেন ইনিকি ছিল সর্বশেষ বড় হারিকেন। ক্যাটাগরি-৪ মাত্রার ওই ঝড়ে ছয়জন নিহত এবং প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। দীর্ঘ সময় পর আবারও সরাসরি হারিকেনের আশঙ্কায় হাওয়াইয়ের বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।