কৃষিতে বহুল ব্যবহৃত অত্যন্ত বিষাক্ত আগাছানাশক প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে সরকার। দেশে থাকা এই গ্রুপের বালাইনাশকের মজুত আগামী ছয় মাসের মধ্যে শূন্য করতে হবে। একই সঙ্গে এ গ্রুপের বালাইনাশক আমদানি, নতুন নিবন্ধন এবং বিদ্যমান পণ্যের লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর ফার্মগেটে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠিত বালাইনাশক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির (পিটাক) ৯১তম সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভার কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে প্যারাকোয়াট গ্রুপের বালাইনাশকের মজুত ৩৯৫ টন। চিঠি জারির পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে এই মজুত শূন্য করার বিষয়ে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে গ্লাইফোসেটের ক্ষেত্রে কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, গ্লাইফোসেট গ্রুপের বালাইনাশকের অবস্থা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত পিটাকের ৮৮তম সভায় নেওয়া আগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও পিটাকের সভাপতি ড. মো. আবদুছ ছালাম। তিনি সমকালকে বলেন, জাতীয় জীববৈচিত্র্য কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে ২৫ শতাংশ বিপজ্জনক বালাইনাশক ধাপে ধাপে কমিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেটের বিষয়ে এবার গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হয়েছে। দেশে থাকা প্যারাকোয়াট গ্রুপের বালাইনাশকের মজুত আগামী ছয় মাসের মধ্যে শূন্য করতে হবে। এ ছাড়া ৮৮তম সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্লাইফোসেটের মজুতও শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে এ দুটি গ্রুপের বালাইনাশক আমদানি, নতুন নিবন্ধন এবং বিদ্যমান পণ্যের লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ থাকবে।
সভায় উপস্থিত ছিলেন গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কিটতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আহসানুল হক বলেন, প্যারাকোয়াট ও গ্লাইফোসেট– দুটিই আগাছা দমনে ব্যবহৃত রাসায়নিক। তবে জনস্বাস্থ্য নিয়ে প্যারাকোয়াটের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ অনেক বেশি। এবারের পিটাক সভায় বিপজ্জনক বালাইনাশক বাজার থেকে প্রত্যাহারে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র পরিদর্শন, বন্দরে বালাইনাশক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি, গবেষণা করে ভারী ধাতু দূষণের উৎস খুঁজে দেখার মতো বেশ কিছু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ব্রাজিলসহ বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কারণ এই আগাছানাশকটি পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। তবে বাংলাদেশে এতদিন কৃষিতে এর ব্যবহার বন্ধের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বাংলাদেশে প্যারাকোয়াটের বিষক্রিয়া নিয়ে চলতি বছরের মে মাসে প্রকাশিত এক গবেষণায়ও উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
আমেরিকান সোসাইটি অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন সাময়িকীতে গত মে মাসে ‘ক্লিনিক্যাল অ্যান্ড ল্যাবরেটরি প্রোফাইল অব প্যারাকোয়াট পয়জনিং: এ টক্সিকোলজিক্যাল ক্রাইসিস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ১০টি তৃতীয় স্তরের হাসপাতালে ২০১৩ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৪২০টি প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়ার ঘটনা শনাক্ত করা হয়েছে। ২০২৪ সালে এক বছরে এসব হাসপাতালে ৪৯৩টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়, মারা যায় ২১২ জন। বিস্তারিত তথ্য পাওয়া ২৫৭ রোগীর মধ্যে ৪৩ দশমিক ২ শতাংশ মারা যান। গবেষণায় অংশ নেওয়া হাসপাতালগুলো দেশের ৬৫ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠীকে সেবা দেয়।
গবেষণাটির অন্যতম লেখক ও টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক মো. আবুল ফয়েজ বলেন, প্যারাকোয়াট বিষক্রিয়া বাংলাদেশে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠছে। প্যারাকোয়াট নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন ধরে কঠোর নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। টক্সিকোলজি সোসাইটি অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৭৭টি দেশে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোও বলছে, ৭০টির বেশি দেশে এ রাসায়নিক নিষিদ্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য ও চীনেও এর ব্যবহার নিষিদ্ধ।
বাংলাদেশে অবশ্য এত দিন এটি কৃষিতে ব্যবহার হয়ে আসছিল। ২০২৬ সালের মেতে প্রকাশিত গবেষণায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, ২০১৩ সালে দেশে প্যারাকোয়াট আমদানি ছিল ৫৩ টনের কিছু বেশি; ২০২৩ সালে তা বেড়ে ৪ হাজার ৬৯৫ টনে দাঁড়ায়।
প্যারাকোয়াটের পাশাপাশি গ্লাইফোসেট নিয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে পিটাক এবার নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। কার্যবিবরণীতে বলা হয়েছে, গ্লাইফোসেট গ্রুপের বালাইনাশকের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত আগের সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
গ্লাইফোসেট বিশ্বের অন্যতম বহুল ব্যবহৃত আগাছানাশক। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা ২০১৫ সালে গ্লাইফোসেটকে মানুষের জন্য সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী বা ‘গ্রুপ ২এ’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করে। সংস্থাটি মানুষের ক্ষেত্রে সীমিত প্রমাণ, প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় পর্যাপ্ত প্রমাণ এবং জিনগত ক্ষতির বিষয়ে শক্তিশালী প্রমাণের কথা জানিয়েছিল।
অন্যদিকে, ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের ২০২৩ সালের মূল্যায়নে গ্লাইফোসেটকে ক্যান্সার সৃষ্টিকারী, জিনগত পরিবর্তনকারী বা প্রজননক্ষমতার জন্য বিষাক্ত হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করার বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড পূরণ হয়নি বলে জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থাও বর্তমানে নতুন করে গ্লাইফোসেটের স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন করছে; ২০২৬ সালের শেষ দিকে হালনাগাদ মূল্যায়ন প্রকাশের কথা রয়েছে।
গ্লাইফোসেটের বিষয় আন্তর্জাতিকভাবে আরও আলোচিত করেছে দক্ষিণ লেবাননের ঘটনা। লেবাননের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত ১০ জুন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ ও জাতিসংঘের মহাসচিবের কাছে অভিযোগ করে, ২০২৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ সীমান্তের কয়েকটি গ্রামে গ্লাইফোসেট ছিটিয়েছে। লেবাননের সরকারি গবেষণা সংস্থার প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা ওই অভিযোগে বলা হয়, আইতা আল-শাব, রাস আল-নাকুরা ও ধাইরা এলাকার মাটির নমুনায় গ্লাইফোসেটের উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়