নিজ দেশে খেলার অধিকার নেই, তবুও ফিরেছে আফগান নারী দল

ছবি: সংগৃহীত

নিজ দেশে ফুটবল খেলার অধিকার হারিয়েছিলেন তারা। তালেবান শাসনে ভেঙে যায় জাতীয় দল, ছড়িয়ে পড়তে হয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে। চার বছরেরও বেশি সময় পর অবশেষে নিজ দেশ থেকে প্রায় ৮ হাজার মাইল দূরে আবারও এক জার্সিতে মাঠে নেমেছেন আফগানিস্তানের নারী ফুটবলাররা। পরাজয় নয়, নিউজিল্যান্ডে তাদের এই প্রত্যাবর্তনই হয়ে উঠেছে সাহস, সংগ্রাম আর স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার এক অনন্য গল্প।

তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর আফগানিস্তানে নারীদের খেলাধুলা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালে গঠিত জাতীয় নারী ফুটবল দলটিও ভেঙে পড়ে। নিরাপত্তার শঙ্কায় খেলোয়াড়দের অনেকেই দেশ ছেড়ে আশ্রয় নেন অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, পর্তুগালসহ বিভিন্ন দেশে।

দীর্ঘ চার বছরেরও বেশি সময় পর সেই ফুটবলাররাই আবার একত্রিত হয়েছেন নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে। এবার তারা পরিচিত ‘আফগান উইমেন ইউনাইটেড’ নামে। নির্বাসিত আফগান নারী ফুটবলারদের নিয়ে গড়া দলটি সেখানে প্রশিক্ষণ শিবিরে অংশ নিয়েছে এবং কুক দ্বীপপুঞ্জের বিপক্ষে দুটি প্রীতি ম্যাচও খেলেছে।

অকল্যান্ডে প্রথম ম্যাচের আগে ড্রেসিংরুমের পরিবেশ ছিল আবেগে ভরা। দেয়ালে টানানো ছিল আফগানিস্তানের জাতীয় পতাকা, বাজছিল জাতীয় সংগীত। বহুদিন পর দেশের পতাকার সামনে দাঁড়িয়ে অনেক ফুটবলারই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। কোচের উদ্বুদ্ধকরণ বক্তব্যের পর মাঠে নামেন তারা, যে খেলার অধিকার একসময় তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

এই প্রত্যাবর্তনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি এসেছে ফিফার কাছ থেকে। দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার পর চলতি বছরের এপ্রিলে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিদ্ধান্ত নেয়, তালেবান সরকারের স্বীকৃতি ছাড়াই নির্বাসিত এই দল ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় আফগানিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে। ফলে অলিম্পিক ও নারী বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে খেলার পথও খুলে গেছে তাদের সামনে।

দলের মিডফিল্ডার মানোজ নুরির গল্প যেন আফগান নারী ফুটবলেরই প্রতিচ্ছবি। কাবুলে ছোটবেলায় ছেলেদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন তিনি। পরিবারের আপত্তির কারণে মুখ ঢেকে অনুশীলন করতে হতো, যাতে কেউ চিনতে না পারে। পরে জাতীয় লিগে খেলেছেন, শিরোপা জিতেছেন, ব্যক্তিগত পুরস্কারও পেয়েছেন। কিন্তু টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ার পর বিষয়টি জানাজানি হলে তার বড় ভাই ক্ষুব্ধ হন। ফুটবল ছাড়ার চাপও আসে পরিবারের পক্ষ থেকে।

একসময় খেলা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলেও পরে আবার মাঠে ফেরেন নুরি। জার্মানিতে থাকা আরেক ভাইয়ের সহায়তায় নতুন করে শুরু করেন ফুটবলজীবন।

তালেবান ক্ষমতায় আসার পর দেশ ছাড়ার সময় নিজের জেতা পদক ও ট্রফিগুলো বাড়ির বাগানে পুঁতে রেখে আসেন তিনি। এখনো সেগুলো সেখানেই আছে। নুরির বিশ্বাস, একদিন তিনি দেশে ফিরবেন, নিজের হাতে তুলে আনবেন সেই স্মৃতিগুলো।

বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস করছেন নুরি। পরে নিজের মা ও বোনকেও সেখানে নিয়ে গেছেন। নুরির আশা, একদিন তার বড় ভাইও বুঝতে পারবেন; ফুটবল খেলা কোনো অপরাধ নয়।

দলের আরেক সদস্য নাজমা আরেফির অভিজ্ঞতাও কম কঠিন নয়। আফগানিস্তানে ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায়ও অনুশীলন করেছেন তিনি। পরে তার দল জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হলে হেরাত শহরে নারী ফুটবল নিয়ে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও বদলাতে শুরু করে। বর্তমানে ইংল্যান্ডের ডনকাস্টারে বসবাস করছেন নাজমা। অপরাধবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলছেন ফুটবলও।

বিবিসির প্রশ্নে তালেবানের ক্রীড়া পরিচালক আহমাদুল্লাহ ওয়াসিক নারী দল নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তবে তিনি ফিফার প্রতি আফগানিস্তানে ফুটবল কার্যক্রম পুনরায় চালুর আহ্বান জানিয়েছেন।

অকল্যান্ডে কুক দ্বীপপুঞ্জের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে ১–০ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে ৩–০ গোলে হেরেছে আফগান উইমেন ইউনাইটেড। তবে ফল নয়, এই দুই ম্যাচের গুরুত্ব অন্য জায়গায়। নির্বাসন, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা আর বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যেও তারা আবার মাঠে ফিরেছে। সেই প্রত্যাবর্তনই জানিয়ে দিয়েছে, প্রতিকূলতা যতই কঠিন হোক, আফগান নারী ফুটবলারদের স্বপ্ন থামিয়ে রাখা যায় না।


  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সাদ্দাম-ইনানকে ফোনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন ওবায়দুল কাদের

জবিতে সব ধরনের সভা সমাবেশ মিছিল নিষিদ্ধ

চ্যাটজিপিটি নিয়ে ছড়িয়েছে নতুন শঙ্কা

জ্বালানি-গ্যাস সংকট ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশ

বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় গানে গানে জুলাইয়ের দ্রোহ ও স্বপ্ন

নিজ দেশে খেলার অধিকার নেই, তবুও ফিরেছে আফগান নারী দল

কুষ্টিয়ায় বিএনপি নেতার ওপর হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণ

ঢাকার আবহাওয়া যেমন থাকবে আজ

হরমুজ প্রণালি খোলার আশায় বিশ্ববাজারে বাড়ল স্বর্ণের দাম

জুলাইয়ের কৃতিত্ব নেয়ার জন্য সবাই প্রতিযোগিতায় নেমেছে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

১০

ওমানের সঙ্গে হরমুজ চুক্তি: নৌ চলাচলে ইরানের অভূতপূর্ব নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা

১১

নিভল আরও ৫ প্রাণ, থামছেই না হাম উপসর্গে মৃত্যুর মিছিল

১২